জীবন এক আশ্চর্য দূরবীন, কবি - সৌমিত বসু
জীবন এক আশ্চর্য দূরবীন
সৌমিত বসু
১
জেনেছি তোমায় আমি
যেভাবে সমুদ্র চেনে তীব্র বালুকনা
একটি জীবন থেকে ঝ'রে পড়া আহত রাত্রিকে
কাঁধে করে হেঁটে চলে সন্ধ্যার নিভে আসা আলো।
সেই আলো মুক্ত হ'য়ে ফুটেছে তোমার মুখে
ওগো চেনামুখ,
আমাকে পেরিয়ে তুমি যেও না আশ্বিনে।
২
তোমার কপাল জুড়ে হারানো আকাশে
মেঘ হয়, বৃষ্টি হয়
ঘুমের ভেতর ঢুকে
ঠোঁট রাখে কেউ।
শরীরে জড়ানো ঘুম
সন্তর্পণে খুলে
তুমি তাকে ঢেলে দাও কাহার গভীরে।
ওগো সুন্দর
শেষবার বলো, তুমি কার সুন্দর?
৩
সমুদ্র দুয়ারে এসেছে
তুমি একবার উঠে এসে
ছুঁয়ে দেখো
ফেনার মাথায় আঁকা স্বজনের মুখ
তুমি একবার স্মৃতি দিয়ে সাজাও তাহারে।
৪
গোপন কথারা এসে
শুড় তুলে তোমায় নামায়
কতদিন অন্তহীন প্রতীক্ষার পর
তুমি ঝুলে পড় রাত্রির ট্রাপিজে।
যতবার অসহায় ভেবে
খোঁপায় গেঁথেছি আলো
তারা পথ ভেবে ফিরে গেছে মাঠের ভিতরে।
দুহাত বাড়িয়ে তুমি দেখে যাও
কিভাবে মৃত্যু লেগে নুপুরের গায়ে।
৫
দিগন্তবিস্তৃত আলো
আমি তুলো ভেবে বালিশে জমাই।
যাতে ঘুম এলে স্বপ্নে আসে জাদুকর
হারানো বোতাম ঘিরে জেগে ওঠে মহল্লার কালো আর খুল্লামখুল্লা ধেয়ে আসা আঁশবটি
ধাঁধার সৎকার করে জুড়ে যায়।
জীবনের সমস্ত ব্যথারা জুড়ে জুড়ে জমা হয় টুপির ভেতরে। একদিন কেউ এসে রুমাল নাড়িয়ে টুপির ভেতর থেকে পায়রা ওড়াবে,
একদিন কেউ এসে আচম্বিতে মিশে যাবে
তোমার হলুদমাখা আয়না শরীরে।
৬
জলের ভেতর থাকি
পাছে কেউ ছুঁয়ে ফেলে জ্বরের পুতুল।
প্রতিদিন কথা হয়
প্রতিদিন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা।আদপে আপোষ ভেবে গায়ে মাখি
আর তুমি কবির আঁধার দেখে
ফোঁটা ফোঁটা অন্ধকার হাসো।
৭
জলের ভেতর থেকে মুখ তোলে আহত হরিণ
দূরে মাঠের ভেতর দিয়ে
সম্পর্করা হাত ধরাধরি করে হেঁটে যায়।
কোথা দিয়ে আসে আর কোথায় বা যায়
এসব জানতেই আমি ঝুঁকে পড়ি জলের ওপর
যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সমস্ত ব্যাথা, সাদা পাতাদের সব নিষ্কলঙ্ক ঘুম,ভেসে যায় স্রোতের কার্নিশে।
আমি অসহায় মুখ তুলি তোমার ছায়ায়
আমার নিজস্ব ঘুম এখনো তোমায় ছেড়ে অনেক উঁচুতে।
৮
হাঁড়ির ভেতর থেকে
মুখ তুলে দাঁড়ালো যে মেয়ে
সে এখন সংসার চেনে
সে এখন সাঁতার কাটতে যায় মেঘেদের দেশে।
শালিখের মুখ থেকে ধান খুঁটে
সে কেমন জেনে গেছে পোড়া বাড়িঘর ঠোঁট রাখে হিংসার কপালে।
দূরে নৌকো টিমটিম
পাটাতন সরিয়ে উঠে আসে যে লিংগদন্ড
সেও দেখি ছেলের বয়েসী।
হাঁড়ির ভেতর থেকে ঘষে ঘষে তোলা জন্মদাগ
তোমার চোখের নিচে আজো লেগে আছে।
ওগো বেমানান
৯
সব ডাকা একদিন জড়ো হবে উঠোনে তোমার
সমস্ত চিঠি জেনো একদিন উড়ে যাবে গ্রামের ওপারে
রাত্রিদের ভাইবোন নেই
সাদা চুল বিধবারা তার দুইহাত ধরে চলে যায় আগুনের দিকে
দরজার পাশে থাকা বন্দুকের নল তাকে ডাকে
নদীর ওপার থেকে ছুড়ে দেওয়া ভোরের আলোয় তারা চিনে নেয় অজানা ছুরির বাঁট।
এখনো কথার ফাঁকে ধুলো ওড়ে,জঙ্গলের ধার ঘেঁষে যেসব জীবন, দুহাত বাড়িয়ে ডাকি চইচই।
