উমর ফারুক-এর একগুচ্ছ কবিতা
কবি উমর ফারুক মুর্শিদাবাদের একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ উদীয়মান কবি। যিনি সমকালীন বাংলা কবিতায় নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর তৈরি করার পথে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর লেখায় ব্যক্তিজীবনের অনুভূতি, সমাজবাস্তবতা, প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব ও মানুষের অন্তর্দহন গভীর আবেগের সঙ্গে প্রকাশ পায়। সহজ অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা, চিত্রময় উপমা এবং অনুভূতির ঘনত্ব তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও কবিতার প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের নানা অনুষঙ্গ তাঁর লেখাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তিনি শুধু প্রেম বা ব্যক্তিগত অনুভূতির কবিতাই লেখেন না, বরং সময়, সমাজ ও মানুষের মানসিক টানাপোড়েনও তাঁর কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উমর ফারুকের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'বন্ধ জানালার ওপারে’ পাঠক মহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বইটিতে মানুষের অন্তর্জগত, নীরব কষ্ট, স্মৃতি ও অপ্রকাশিত অনুভূতির এক মর্মস্পর্শী প্রকাশ দেখা যায়। তাঁর কবিতার ভাষা আধুনিক হলেও তাতে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গভীর মানবিকতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
বর্তমানে তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়েও লেখালেখি করছেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা কবিতার প্রতি আগ্রহ তৈরিতেও তিনি ভূমিকা রাখছেন। তাঁর সাহিত্যযাত্রা এখনও চলমান, এবং ভবিষ্যতে বাংলা কবিতায় তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন—এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়।
একটি নিস্তব্ধ রাতের মত
উমর ফারুক
একটি নিস্তব্ধ রাতের মত রাত থাকলে
সংকটময় জীবনের বিকেল বেলায়
অগভীর নদীতে সাঁতার কাটতো দুইটি রাজহাঁস ।
মাকড়সার জালের মত ছড়িয়ে পড়া
ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়ত
একালের দুর্লভ যাত্রাপথ—
অসত্যের ধ্বজা উড়িয়ে চলত উদ্যম নৃত্য
শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে করতে
বাতাসের গায় বিঁধে ফেলত তীর ।
দেহ বিক্ষত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে সূর্য জেগে থাকে রাত্রির অন্ধকার গুহায়
আলো নেই ভালো নেই কোনো পাখি
ক্ষুদ্র নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠে চোখ
বিস্ফোরণে রুদ্ধ হলো সমাজের গলিপথ
একাকি শূন্য থেকে বেরিয়ে এলো মৃত্যু
নরকের সব দরজা খুলে দাও—
যমরাজ জেগে উঠেছে প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়
উপলব্ধি
উমর ফারুক
দরজার সামনে রাখা আছে কাঁচের গ্লাস
ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা একটি দূর্লভ তারিখ
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত
তখন টিকটিকির শব্দ শোনা গিয়েছিল —
দিয়েছিল তিন সত্যির সায়
হাজার বছরের পুরনো দিনের মত
ভুলে যাওয়া গন্ধের মত
মনে পড়ার উপলব্ধি লিখে ফেললাম।
কেবল একটি চাঁদকে হাসতে দেখে
কুকুরটি
উমর ফারুক
একটি প্রবীণ কুকুর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে
একা একা নিঃসঙ্গ—
আবেগের মানুষ তাকে গ্রহণ করেনা
সরু গলিপথ দিয়ে হেঁটে চলে যায় দূরে
দূর দিগন্তের মরিচিকায়—
আবার পুরোনো গতিতে ফিরে আসে
নির্জন গহীন আঁধারে..
কুকুরটির চিৎকার শুনে ছুটে যায় মানুষ মানুষগুলো খুব অদ্ভুত সুন্দর
এক টুকরো হার ফেলে রাখলেও
কুকুরের জন্য কুড়িয়ে খায়
কুকুরটি বেড়ালের মতো ছুটে
রাস্তার ধারে আনাচে কানাচে
হাত পা ছড়িয়ে ,
মানুষগুলো নির্দয় ও অদ্ভুত
বাঘের মতো থাবা বসিয়েছে রাতে
সিংহের মতো গর্জে উঠছে
একটি ঠুনকো জীবনের সুতোয় বাঁধা
জীবনের অন্তিম মুহূর্ত গুলোতে !
লেখা
উমর ফারুক
লেখাগুলো জমে থাক
হৃদয়ের কথা গুলো দিক নাড়া
লেখাগুলো জুড়ে থাক
বয়ে যাক মন্থর শ্রাবণ ধারা
এ মনের ক্যানভাসে ছবি আঁকি
লেখা বুকে এভাবে বেঁচে থাকি
লেখা হোক ভালোবাসা কল্পনা
রহস্য ঘিরে থাকা জল্পনা!
লেখা হোক অন্ধকার রাত থেকে
টিপটিপে ক্ষুদ্র তারা দেখে
লেখা হোক জোনাকির আলোতে
হয়নি বলা এমনও অনেক কথা!
টিপটিপ বৃষ্টি
উমর ফারুক
সাগরের তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে
থাকতে থাকতে যদি ক্লান্ত হও
তাহলে তুমি মনে করবে
একটি স্বাধীন নগরে বাস করছ
এখানে পড়েছে ভিনেগারে ভিজিয়ে রাখা জীবনের একটি স্বপ্ন
পর্বত শৃঙ্গের মাথায় উঠেছে হাত ।
কিন্তু সাগরের বুকে জড়িয়ে ধরা পাথর
যখন জীবনের অমূল্য সত্য লুকিয়ে রাখে
অশালীন ছিটেফোঁটা গ্রাস করছে টিপটিপ বৃষ্টি
কাপড়ের কল থেকে শুষে নিচ্ছে জল।
