বিরহী মানুষ ও অস্ফুট আর্তনাদের যুগলবন্দী (আঁকা বাঁকা শূন্য পথ), আলোচক - আবদুস সালাম

বিরহী মানুষ ও অস্ফুট আর্তনাদের যুগলবন্দী (আঁকা বাঁকা শূন্য পথ), আলোচক - আবদুস সালাম

বিরহী মানুষ ও অস্ফুট আর্তনাদের যুগলবন্দী (আঁকা বাঁকা শূন্য পথ)

কবি: অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়

প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০২৫

প্রচ্ছদ: প্লাসেন্টা গ্রাফিক্স

প্রকাশক: প্লাসেন্টা পাবলিকেশন্স, বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিট, কলকাতা–৭৩

আলোচক: আবদুস সালাম

T S Eliot বলেছেন ‘Genuine poetry can communicate before it is understood’

“সত্যিকারের কবিতা অর্থ পুরোপুরি অনুধাবন করার আগেই পাঠকের মনকে স্পর্শ করে।”

এখানে এলিয়ট বলতে চেয়েছেন, একটি উৎকৃষ্ট কবিতার শক্তি শুধু তার বাচ্য অর্থে নয়; তার শব্দ, ছন্দ, ধ্বনি, চিত্রকল্প ও আবহ এমন এক অনুভূতি সৃষ্টি করে, যা পাঠক অনেক সময় কবিতার অর্থ সম্পূর্ণ বুঝে ওঠার আগেই অনুভব করতে পারেন। অর্থাৎ, কবিতা আগে অনুভূত হয়, পরে সম্পূর্ণরূপে বোঝা যায়।

একটি ভালো কবিতা লেখা যেমন সহজ নয় তেমনি সহজ নয় কবিতাকে ভালোভাবে বোঝাও তার মূল্যায়ন করা। জীবনানন্দের কথাই “কবিতা পড়ে সিদ্ধান্তের ক্রমিক নির্মলতায় পৌঁছাবার শক্তি তেমনটা মুষ্টিমেয় নিবিষ্ট বিচার শীল পাঠকেরই থাকে”।

তবু কবিতার সামগ্রিক মূল্যায়নের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। যদিও কবিতা ভাব দিয়ে লেখা হয় না লেখা হয় শব্দ দিয়ে। কবিতায় শব্দ, শব্দ-চিত্র অভিধান ও ব্যাকরণের শাসন থেকে মুক্ত ও স্বাধীন। সার্থক কবিতায় শব্দের ভেতর দিয়ে কবির ভাবনার অভিজ্ঞান তো ফুটে উঠবে এটাই তো স্বাভাবিক। কোন সফল কবিতাই নিছক শব্দ চিত্রকল্পের স্বেচ্ছাচার নয় বরং একটি কবিতার অন্তর্গত ভাবনাটিকে খুঁজে পেতে সচেতন পাঠককে তাই সচেষ্ট থাকতে হয়।

কবিতার সার্থকতা কেবল ব্যাখ্যা যোগ্য অর্থে নয়, তার নান্দনিক ও আবেগময় যোগাযোগ ক্ষমতার মধ্যেও নিহিত।

কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় মূলত নব্বই দশকের! নব্বই দশকের কবিদের যে সকল লক্ষণ কবিতায় লক্ষ্য করি তা মোটামুটি এই রকম।

নব্বই দশকের বাংলা কবিরা বিশ্বায়ন, উদারীকরণ, সাম্প্রদায়িকতা, ভোক্তাবাদ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতার অভিঘাতকে তাঁদের কবিতায় নতুন ভাষা ও আঙ্গিকে প্রকাশ করেছেন। এই দশকের কবিতায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক সংকট পাশাপাশি চলেছে; প্রতীক, চিত্রকল্প, ভাঙা বয়ান এবং ভাষাগত পরীক্ষানিরীক্ষা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ফলে নব্বইয়ের কবিতা একদিকে আত্মঅন্বেষী, অন্যদিকে সময়-সচেতন ও বহুমাত্রিক।

কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের আঁকা বাঁকা শূন্য পথ তেমনই এক কাব্যগ্রন্থ যা আমাদের মনে দোলা দেয়। এই কাব্যে তিনি ৫৮টি কবিতা ঠাঁই দিয়েছেন।

যেসকল কবিতা মনে দাগ কেটে যায় তার কিছু কথা তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

মুহূর্ত কাল

“একটা মুহূর্ত কাল তোর সাথে দেখা
ছিল সেখানে উত্তর সমীরণ
আর এই সমিরন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেত
বড় বড় ইউক্যালিপটাস এর গাছগুলোকে—

আবার দেখি
এক অন্ধকারের ভিতর কোথায় চলেছি
কোন আলোর রেখা নেই
চারিদিকে ঘন অন্ধকার, শুধু অন্ধকার
একটা মুহূর্ত কালে তোর সাথে দেখা হয়েছিল—”

এটা একটা বিরহ-স্মৃতির কবিতা। "একটা মুহূর্তকালে তোর সাথে দেখা" দিয়ে শুরু, "একটা মুহূর্তকালে তোর সাথে দেখা হয়েছিল" দিয়ে শেষ। মাঝখানে পুরোটা একটা সম্পর্কের ভাঙন-গল্প।

– শুরুতে প্রকৃতি, ইউক্যালিপটাস, পাতা কুড়ানো, গল্প করতে পথ চলা — সম্পর্কের সরল, সুন্দর দিনগুলো।

– মধ্যে "তোর পছন্দ ছিল সমুদ্রপথ, আমার নদীপথ" — মতের অমিল। এখান থেকেই দূরত্ব।

– শেষে: অসময়ের বৃষ্টি, দিকহীন ছোটা, গুহাপথ, ঘন অন্ধকার — সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরের শূন্যতা।

বইয়ের নাম আঁকাবাঁকা শূন্য পথ — এই কবিতাটাই যেন বইয়ের নামের ব্যাখ্যা। জীবনটা আঁকাবাঁকা, আর শেষে থেকে যায় শূন্য পথ। এই কবিতা টিই যেন কাব্যগ্রন্থের মূল সুর।

– নদীপথ vs সমুদ্রপথ = দুজনের জীবনদর্শনের অমিল।

– অন্ধকার গুহাপথ = বিচ্ছেদের পর মানসিক অবস্থা।

"একটা মুহূর্তকালে" দিয়ে শুরু ও শেষ। এটা কবিতাকে একটা বৃত্তের মতো করে দিয়েছে। শূন্যই থেকে গেল।

– "কথা বলতে বলতে ভেঙে ফেলতাম টুকরো টুকরো পাতা" — এই লাইনটা অসাধারণ। আড্ডা, অনুরাগ আর সময় নষ্ট করার সুখ একসাথে ধরা পড়েছে।

– "দিকহীন ভাবে ছুটতে লাগলাম দুজনে" — ঝগড়া বা বিচ্ছেদের পর মানুষের হাহাকারটা সুন্দর ভাবে ধরা পড়েছে এখানে।

– "চারিদিকে ঘন অন্ধকার, শুধু অন্ধকার" — এখানে অন্ধকার শুধু বাইরের নয়, ভিতরেরও।

এখানে স্মৃতিকে খুব নিষ্ঠুর আর খুব কোমল — দুভাবেই ধরেছেন। এখানেই কবির মুন্সিয়ানা।

সারা কবিতা জুড়েই আঁকা বাঁকা শূন্য পথের কোলাজ। যেটা নদীও নয়, সমুদ্রও নয় শেষমেশ গিয়ে পড়েছে অন্ধকার গুহায়।

ভাঙা ঢেউ

অস্থিরতা আর অশান্ত সময়ের ভিতর যাপিত জীবনে নৈূরশ্যের ঘূর্ণিপাকে কবি যেন হারিয়ে যেতে চলেছেন।

“শান্ত বেলাভূমির উপর পা ফেলে যাই
সমস্ত দিক জুড়ে তপ্ত দুপুর।

নিস্তব্ধ বনজ গন্ধে আঁকা বাঁকা পথে চলে যাই পৃথিবীময় এক নিদারুণ অস্থিরতা।

ভাঙ্গা মেঘপথে যেতে যেতে ডানা মেলি
দিগন্ত জুড়ে একখণ্ড নীরবতা।

তারপর যে কোথায় হারিয়ে যায়— হারিয়ে যাই।”

তাইতো আমরা যাপনের অনির্দিষ্ট, অনির্নেয় পথে হারিয়ে যায় অজান্তেই।

“যেখানে মৃত্যুর পর জীবন খুঁজতে থাকবে
অনেক না বলা কথার জন্য
হৃদয় জুড়ে ভাঙা ঢেউএর মত শুধু বলে যাবে
কে শুনবে কে শুনবে না জানি না
শুধু হাওয়া পথে ভেসে যাবে।” — ভাঙা ঢেউ

কবি যেন পরকালে মিশে গেছেন। উপলব্ধি করতে পারছেন মৃত্যুর পরে আমাদের কথা কি কেউ শুনবে। অনন্ত জীবনের কথাগুলো কি তবে শুধু ভেসে বেড়াবে? পরকালের জিজ্ঞাসা কবির মনে আলোড়ন তোলে।


আমাদের ভারতবর্ষ

একদম সামাজিক-রাজনৈতিক কবিতা। কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় এখানে দেশকে মন্দির-মূর্তি দিয়ে নয়, মানুষ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

“যেসব মানুষেরা সঙ্গে নিয়ে আসে অন্যজনকে
নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য
তারাই আমাদের ভারতবর্ষ।”

আবার বলেছেন—

“যে সব মানুষেরা ক্লান্ত হয়ে ব্লক অফিস থেকে বাড়ির দিকে ফিরে বিষন্নতা নিয়ে
তাঁরা আমার ভারতবর্ষ।”

আবার লিখেছেন—

“যেসব মানুষেরা পঞ্চায়েত অফিসের দিকে
আবাস গৃহের জন্য নিস্পলক দৃষ্টি মেলেন
তারাই আমাদের ভারতবর্ষ।”

“যেসব মানুষেরা গান্ধী মূর্তির পাদদেশে
অবস্থান করেন কোন স্বপ্ন ভাঙার জন্য
তাঁরাই হলেন আমাদের ভারতবর্ষ।” — আমাদের ভারতবর্ষ

কবিতার প্রতিটা স্তবকের শেষ লাইন একই: "তাঁরাই আমাদের ভারতবর্ষ"। কবি এখানে নেতা, মন্ত্রী, সেলিব্রিটি কাউকে দেশ বলেননি। দেশ বলেছেন সাধারণ মানুষকে।

  • গণতন্ত্রের একদম তৃণমূলের ছবি। রাজনীতির কারবার নয়, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ।
  • "যারা রোদে দাঁড়ায় রেশন দোকানের সামনে"
    দারিদ্র্য, লাইন, অপেক্ষা — এটাই ভারতবর্ষের একটা বড় অংশ।
  • "যারা ক্লান্ত হয়ে ব্লক অফিস থেকে ফেরে বিষণ্ণতা নিয়ে"
    আমলাতন্ত্র, ফাইল, হয়রানি। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লড়াই।
  • "যারা পঞ্চায়েত অফিসে আবাস গৃহের জন্য নিস্পলক দৃষ্টি মেলে"
    স্বপ্ন, আশা, সরকারি সাহায্যের জন্য অপেক্ষা।
  • "যারা গান্ধী মূর্তির পাদদেশে অবস্থান করে কোনো স্বপ্নভাঙার জন্য"
    প্রতিবাদ, আন্দোলন, গণতন্ত্রের শেষ আশ্রয়।

"তাঁরাই আমাদের ভারতবর্ষ" — এই রিফ্রেনটা কবিতাকে সংগীতের মতো বেঁধেছে। পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দেয়। একদম সহজ সরল ভাষায় এঁকেছেন ভারতের ছবি।

"ব্লক অফিস", "রেশন দোকান", "পঞ্চায়েত" — একদম আমাদের চেনা শব্দ।

কবিতায় দেশের জয়গান করেন নি। বরং হতাশাগ্রস্ত দৈনন্দিন খেটে খাওয়া মানুষের অবহেলা আর হতাশার ছবি এঁকেছেন। এখানে আছে ক্লান্তি, লাইন, বিষণ্ণতা, নিস্পলক দৃষ্টি, অবস্থান।

যন্ত্রণা, লড়াই আর অপেক্ষার নামই ভারতবর্ষ। আর যারা এইগুলো বয়ে বেড়ায়, তারাই আমাদের দেশ।

কবির একটি বড়ো গুণ লক্ষ্য করি— তিনি "উপর থেকে" দেখেন না। একদম মাটিতে নেমে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে লেখেন।

রাত ভাঙা সকাল

কবিতার ভাবনা নিছক কোন গল্প নয়। এটা একটা "মুহূর্ত"। সন্তান যখন বাড়ি ছেড়ে নিজের গন্তব্যে যায়, মা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন - সেই রাত ভাঙা সকালটার ছবি।

"রাত ভাঙছে" মানে শুধু ভোর হচ্ছে না। কবির ভিতরের রাতও ভাঙছে। আর মায়েরও বুক ভাঙছে।

"ঝোলাটে দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন আমার ‘মা’"

অনবদ্য চিত্রনাট্য।

  • 'ঝোলাটে' শব্দটা। ক্লান্তি, ঘুম না হওয়া, দুশ্চিন্তা - সব এক শব্দে গেঁথেছেন। বন্ধনীর ‘মা’ - যেন পৃথিবীর সব মা।
  • "দুটো শীর্ণ হাত, কাঁপা কাঁপা ছুঁতে চায় আমাকে, শুধু আমাকে"
    এখানে "শুধু আমাকে" - মায়ের পৃথিবীটা কত ছোট। তার কাছে সন্তানই সব।
  • "ভাঙা ভাঙা ঠোঁট দুটো নড়ে যায়, কী যেন বলে যেতে চায়"
    বলতে পারে না। আবেগে গলা বুজে আসে। এই "না-বলা"টাই সবচেয়ে বড় কথা।
  • "মা’র দৃষ্টি ঠিক তখন বাঁক খাওয়া নদীর মতো.."
    এটা অসাধারণ। নদী বাঁক নেয়, পিছনে ফিরে তাকায়, আবার এগোয়। মায়ের দৃষ্টিও তাই। সন্তান চলে যাচ্ছে, কিন্তু দৃষ্টি পিছু পিছু যাচ্ছে। আর নদীর মতোই সেই দৃষ্টিতে কান্না আছে, বয়ে যাওয়া আছে, কিন্তু থামা নেই।

কবিও কিছু বলতে পারেননি। দুজনেই নীরব। আর এই নীরবতাই সবচেয়ে জোরে চিৎকার করে।

আঁকাবাঁকা শূন্য পথ এর সাথে সম্পর্ক

আগের কবিতায় ছিল প্রেমিকের ছেড়ে যাওয়া, তারপর ছিল সমাজের ছবি। আর এখানে সবচেয়ে আদিম বিচ্ছেদ - মা আর সন্তানের বিচ্ছেদ। জীবনের "আঁকাবাঁকা পথে" হাঁটতে গেলে প্রথম যে ঘরটা ছাড়তে হয়, সেটা মায়ের ঘর। আর সেই শূন্যতা নিয়েই পথ চলা শুরু।

কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় বড় কোনো ঘটনা লেখেন না। তিনি ছোট ছোট মুহূর্তকে কবিতা বানান। "রাত ভাঙা সকাল" সেইরকমই একটা মুহূর্ত, যেটা আমাদের সবার জীবনে একবার হলেও আসে। পড়ার পর অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতে হয়।


জীবন সরলরেখা

এই কাব্যগ্রন্থের আরও একটি কবিতা জীবন সরলরেখা

কবিতার মূলভাব: জীবনের গণিত

কবি পুরো জীবনটাকে একটা জ্যামিতির অঙ্ক দিয়ে বুঝিয়েছেন। দুটো সরলরেখা পাশাপাশি চললে দূরে গিয়ে এক বিন্দুতে মেলে - স্কুলে আমরা এটাই পড়েছি। কিন্তু বাস্তবে? যত কাছে যাই, মিলনবিন্দু তত দূরে সরে যায়।

কবির জীবনদর্শন যে ভাবে ধরা দিয়েছে এখানে।

“যখন একটা রাস্তা দীর্ঘ হয়ে চলে যায়
তখন মনে হয় দুটো সরলরেখা পাশাপাশি
আরো গভীর দৃষ্টি নিয়ে যখন দেখা যায়
তখন মনে হয় দূরে কোথাও কোন এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে গেছে
কিন্তু যখন যাওয়া যায় ঐ স্থানে
তখন মনে হয় আরো দূরে কোথাও মিলিত হয়ে গেছে।” — জীবন সরলরেখা

  • "রাস্তা দীর্ঘ হয়ে চলে যায়" - এখান থেকেই দুটো সরলরেখার ধারণা। দুটো মানুষ, দুটো সম্পর্ক, দুটো স্বপ্ন।
  • "যত যাই কাছে, তত দূরে হয় ঐ মিলিত বিন্দু"
    এই লাইনটাই গোটা কবিতার সার বস্তু নিহিত আছে। সম্পর্ক, স্বপ্ন, সাফল্য - আমরা ভাবি আর একটু গেলেই পাবো। কিন্তু গেলেই সেটা আরও দূরে চলে যায়। সুন্দর জীবন দর্শন।
  • "বোধহয় অন্ধকার নেমে যাবে, কিচ্ছু আর দৃশ্যগত হবে না"জীবন সরলরেখা

পুরো কবিতা জুড়ে "সরলরেখা" আর "বিন্দু"র রূপক। অথচ কোথাও কঠিন লাগে না। কারণ রাস্তা দিয়ে আমরা সবাই হাঁটি।

এই কবিতাটি আঁকাবাঁকা শূন্য পথ এর অবশ্যম্ভাবী কবিতা বলা যেতে পারে। কারণ শেষে গিয়ে মিলন বিন্দুটা শূন্য।

এই কবিতাটি হতাশার কবিতা, কিন্তু নালিশের নয়। সম্পূর্ণ রূপে বোধের কবিতা।

"কোথাও মিলিত হতে চায় না"জীবন সরলরেখা। এই লাইনটা সবচেয়ে নিষ্ঠুর, আর সবচেয়ে সত্যি।


বাউল মেঘ

“বাতাসে উড়ে যাওয়া তুলোর মতো
একটা শীত বিকেল
এসেছিল বেশ অনেকটা কাছে
বলেছিল ধরতে,
ধরতে পারিনি ছড়িয়ে দিয়েছিল অসমাপ্ত কথা।” — বাউল মেঘ

কবিতা টি মূলত না বলা কথার হাহাকার।

এটা একটা মিস হয়ে যাওয়া কথোপকথনের কবিতা। একটা শীত বিকেল, একজন কাছাকাছি এসেছিল, বলেছিল ধরতে, ধরতে পারিনি, অসমাপ্ত কথা ছড়িয়ে চলে গেল — এখানে কবি সারাজীবন সেই কথাগুলো খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

কবিতার সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলো হলো —

  • "বাতাসে উড়ে যাওয়া তুলোর মতো একটা শীত বিকেল"
    শুরুটাই এত নরম। সময়টা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না - তুলোর মতো।
  • "বাউল মেঘ বলেছিল শুনতে, আর যখন শুনতে গেলাম"
    এখানেই ট্র্যাজেডি। সুযোগটা হাতের কাছেই ছিল, কিন্তু ধরতে দেরি হয়ে গেল।
  • "নক্ষত্রের আলো কণাগুলো শিক্ষা অরণ্য ঝর্ণার মতো ঝরে গেল"
    কী অপূর্ব উপমা। কথা না শোনার শাস্তি - আকাশ থেকে আলো ঝরে পড়া। চারপাশটা আলোয় ভরে গেল, কিন্তু ভিতরটা অন্ধকার।
  • "এখনও শূন্যপথের দিকে প্রতীক্ষায় ঐ অসমাপ্ত কথামালার জন্য.."
    কবি আজও কারও পথ চেয়ে বসে আছেন। তার সেই না-বলা কথার জন্য।

বাউল মেঘ—মেঘ এখানে শুধু মেঘ নয়। সে একজন বাউল। উদাসী, পথিক, গানওয়ালা।

(শিক্ষা, অরণ্য, ঝর্ণা) প্রকৃতির সৌন্দর্য এখানে বিষণ্ণতার প্রতীক। এত সুন্দর ঝর্ণা, অথচ কবি "কথাহীন"।

সব জায়গায় একটা "না-পাওয়া" আছে। আছে একটা শূন্যতা। নাথিংলেশ এই কবিতার মূল আকর্ষণ।

কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয় তাইতো — জীবনে আমরা কত কথা বলতে পারিনি, কত কথা শুনতে পারিনি। সেই না-বলা কথাগুলোই বাউল মেঘের মতো আকাশে আকাশে ঘুরে বেড়ায়।

বেলা শেষে

“জীবনের আলো কমে এলে
ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যায়
আমি তখন হারিয়ে যাওয়া
ঋতু কালগুলো খুজি” — বেলা শেষে

বিকেলের শেষ আলোর মতো একটা বিষণ্ণতা যেন ছেয়ে আছে।

জীবনের আলো যখন কমে আসে, তখন মানুষ পিছনে তাকায়। হারিয়ে যাওয়া দিন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ - সবকিছু খোঁজে। কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে একসময় নিজেই "দৃশ্যহীন" হয়ে যায়।

  • "জীবনের আলো কমে এলে ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যায়"
    কী দারুণ বিজ্ঞান আর কবিতার মেলবন্ধন। বয়স বাড়লে যেমন একাকীত্ব বাড়ে, স্মৃতির ছায়াও তেমন লম্বা হয়। তখন কবি "হারিয়ে যাওয়া ঋতুকালগুলো খুঁজে"।
  • "দৃশ্যের খোঁজে থাকতে থাকতে আমি কেমন দৃশ্যহীন হয়ে যাই"বেলা শেষে
    এটা সবচেয়ে শক্তিশালী লাইন। যত খুঁজে, তত নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।
  • শেষে কবি চলে যান "দিগন্তহীন শীতল ভূমিখণ্ডের" দিকে। অর্থাৎ মৃত্যুর দিকে, নিঃসঙ্গতার দিকে।

গোটা কবিতা জুড়ে আলো কমছে, ছায়া বাড়ছে। জীবনের শেষ প্রহরে এসে পারফেক্ট রূপকের ব্যবহার।

মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে যেন চলে যাওয়া: পৃথিবীর টান ছেড়ে চলে যাওয়া। এটা শুধু মৃত্যু নয়, এটা সব মায়া কাটিয়ে দেওয়া। একটি শক্তিশালী রূপকের ব্যবহার করতে শেষ লাইনটি অতীব চমৎকার।

দিগন্তহীন শীতল ভূমিখণ্ড যেখানে শুধুমাত্র ঠান্ডা আর ঠান্ডা। নাম নেই, গোত্র নেই, দিক নেই। শুধু শীতলতা।

"আমি কেমন দৃশ্যহীন হয়ে যাই" - এই লাইনটা অনেকদিন মনে থাকার মতো লাইন।


কবিতা: গোধূলির শেষ বেলায়

“শেষ গোধূলির আলো পড়েছে
স্থির নদীর জলে
জলসিক্ত দুই পাড়
একটা ডিঙি নৌকা দুজন মানুষ
হাতে দাঁড় ও জাল আর অনন্ত সংগ্রাম।” — গোধূলির শেষ বেলায়

শুধু লড়াই আর লড়াই। জীবন যেন অনন্ত সংগ্রাম। নদী পাড়ের মানুষের জীবনে শুধুই লড়াই। একদিকে সাদা ভাতের খোঁজ অন্যদিকে মৃত্যুর হাতছানি। ওরা জানে থেমে গেলে বাঁচা হবে না।

  • "শেষ গোধুলির আলো পড়ছে স্থির নদী জলে"
    একটা ডিঙি নৌকা, দুজন মানুষ, দাঁড় আর জাল। "অনন্ত সংগ্রাম" শব্দটা দিয়েই কবি বলে দিলেন এটা নিছক মাছ ধরার গল্প নয়।
  • "ওরা প্রতিটাদিন রাত্রির আঁধারে হারিয়ে যায়"
    দিনের শেষে আলো খুঁজতে খুঁজতে ওরা নিজেরাই দিক হারায়। এটা শুধু নদীর পথ নয়, জীবনের পথও।
  • "ওরা সাদা ভাত খোঁজে, আশ্রয় খোঁজে"
    সবচেয়ে কষ্টের লাইন। পেটের খিদে, মাথার উপর ছাদের খিদে। কিন্তু আকাশে শুধু শ্বাপদ।
  • "হৃদয় ভাঙে নদী পাড়ের মতো" - এই উপমাটা মারাত্মক। নদী যেমন পাড় ভাঙে, তেমনই ওদের বুকও রোজ ভাঙে।
  • সব ভয়, সব ক্লান্তি সত্ত্বেও "তবুও ওরা নামে গোধুলির শেষ বেলায়"। এই "তবুও"টাই কবিতার প্রাণ। হারবে জেনেও লড়াই।

কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় এখানে কোনো রোমান্টিক নদী আঁকেননি। তিনি আঁকলেন শ্রমের নদী, ক্ষুধার নদী, ভয়ের নদী। আর সেই নদীতে "শেষ গোধুলির আলো" পড়লেও মানুষ নৌকা বায়।

"তবুও ওরা নামে" - এই তিনটে শব্দে পুরো কবিতার, পুরো জীবনের সার। এই কবিতা যেন সময়ের দলিল হিসেবে ধরা দিয়েছে।


সেই অনিত্যের পথে

“লেপের মতো কোনো কোনো শীত সন্ধ্যা
বা কোন ঋষির ধানের মতো ব্রাহ্মমুহূর্ত
আসলে এই পৃথিবীতে পুরাতন সবকিছুরই
বদল হয়ে চলে যায় আবর্জনার মতো
কোন কিছুরই কোন স্থায়িত্ব নেই
সব যেন অনিত্য
আমরা পা ফেলে ফেলে যাই।” — সেই অনিত্যের পথে

একটি সুন্দর বৌদ্ধ দর্শনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। যার মানে স্থায়ী কিছু নেই।

  • "চেনা পথ ধরে যেতে যেতে অচেনা পথ হয়ে যায়"
    আমরা ভাবি এক আর হয় এক।
  • "পথের ধারে ধারে গড়ে উঠছে নতুন বাড়ি"
    ফেলে আসা দিনগুলো ইতিহাস ও স্মৃতিকথা ভীড় করে আসে।
  • "আসলে এই পৃথিবীতে পুরাতন সব কিছুই বদল হয়ে চলে যায় আবর্জনার মতো"
    একদমই নিষ্ঠুর সত্যি। শীতের সন্ধ্যার লেপের মতো, ঋষির ধ্যানের ব্রাহ্ম মুহূর্তের মতো - সব ফুরিয়ে যায়।
  • "কোন কিছুরই কোন স্থায়িত্ব নেই"
    তাই "আমরা পা ফেলে ফেলে যাই"। তাই আমরা হেঁটে চলেছি অনন্তের পথে।

"আবর্জনার মতো" সবচেয়ে কঠিন আঘাতের উপমা তিনি ব্যবহার করেছেন। যে স্মৃতিকে আমরা যত্ন করি, সময়ের কাছে সেটা আবর্জনা।

মুক্ত আকাশ দাও

“অধিকার কেড়ো না
শিল্পী ঈশ্বর প্রেরিত মানুষ
সে গান গাইবে নিজের মতন
কেন তাকে শিকল পরাবে


শেষ লাইনে বলেছেন

কেন কাড়তে চাও
শিল্পীর অধিকার
সে নিজের খেয়ালে হেঁটে যাক
তার পথ আগলে দাঁড়িয়ো না

তাকে মুক্ত আকাশ দাও।” — মুক্ত আকাশ দাও

কবি এখানে শিল্পীর পক্ষে কথা বলছেন। শিল্পী মৌলিক মানুষ। সে নিজের মতো গাইবে, নিজের খেয়ালে হাঁটবে। কেউ তাকে শেকল পরাতে পারবে না। শেষ লাইনে গিয়ে কবির একটাই চিৎকার — "তাকে মুক্ত আকাশ দাও..."

  • "অধিকার কেড়ো না শিল্পী ঈশ্বর মৌলিক মানুষ"
    শিল্পী কে তিনি কতটা শ্রদ্ধা করেন তার প্রমাণ পাই।
  • "সুর ভাসিয়ে আকাশ ছুঁয়ে যাবে"
    কবি দেখালেন মুক্ত গান কী করতে পারে। হৃদয় স্পর্শ করে, মনের ভিতর দোলা দেয়। বাতাসে পাতার মতো, স্বর্গীয় নদীর স্রোতের মতো।
  • "কেন কাড়তে চাও শিল্পীর অধিকার?"
    এটা শুধু প্রশ্ন নয়, এটা যেন ধমক। তারপর সোজা নির্দেশ — "সে নিজের খেয়ালে হেঁটে যাক, তার পথ আগলে দাঁড়িও না।"
  • সব কথা শেষে একটা নরম অনুরোধ — "তাকে মুক্ত আকাশ দাও..." দাবি থেকে অনুরোধে এসে কবিতাটা আরও প্রাণময় হয়ে উঠেছে। এখানেই কবি সার্থক।

এই কবিতাটা গোটা বইয়ের মধ্যে একটা আলোর বিন্দু। এখানে শূন্যতা নেই, এখানে সম্ভাবনা আছে।

কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় এখানে শুধু কবি নন, তিনি একজন শিল্পীর মুখপাত্র হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিলেন — শিল্পকে শাসন করা যায় না। সুরকে বন্দি করা যায় না।


উপসংহার

এটি কবির ষোড়শতম কাব্যগ্রন্থ। তার কবিতা পড়তে পড়তে হারিয়ে যায় সাধারণ মানুষ থেকে আরম্ভ কবি, শিল্পীদের দরজায়। সমাজের সকল স্তরের কথা নির্দিধায় কবিতার উপজীব্য বিষয় করে তুলতে তিনি সিদ্ধ হস্ত।

নব প্রজন্মের কবিতা পাঠক কবিদের আকর গ্রন্থ হিসেবে দিশা দেখাবে বলে আমার বিশ্বাস। ভবিষ্যতে তিনি আরও আরও মননশীল কাব্য গ্রন্থ আমাদের উপহার দিবেন এই আশা করতেই পারি।

বইটি সংগ্রহ করতে যোগাযোগ করুন এই নম্বরে: 8584920259

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url