অনুগল্প: বাবার দল, লেখক - সালেক উদ্দিন
বাবার দল
লেখক: সালেক উদ্দিন
(একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
বিশ্বকাপ এলেই গ্রামটা বদলে যেত।
কেউ বাড়ি রাঙাত সবুজ-হলুদে, কেউ আকাশি-সাদায়। নবজাতকের নাম রাখা হতো বিদেশি ফুটবলারের নামে। বাঁশের মাথায় উড়ত বিশাল বিশাল পতাকা।
দেখলে মনে হতো, গ্রামটা যেন নিজের দেশ ছেড়ে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর নাগরিক হয়ে গেছে।
শুধু গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ মানুষটি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন,
—এত দেশের পতাকা উড়ে, নিজের দেশের পতাকা কোনটা?
কেউ উত্তর দিত না।
সেদিন ব্রাজিলের খেলা।
ম্যাচের এক পর্যায়ে ব্রাজিল পিছিয়ে পড়তেই আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা আনন্দে পটকা ফাটাতে শুরু করল। স্লোগানে মুখর হয়ে উঠল রাস্তা।
কিন্তু খেলা শেষ হলো ব্রাজিলের জয়ে।
এবার উল্লাস বদলে গেল অন্য শিবিরে।
উল্লাস থেকে তর্ক, তর্ক থেকে অপমান, অপমান থেকে ঘৃণা।
পরদিন সালিশ বসল।
রায় হলো।
একদল খুশি হয়ে ফিরল, আরেকদল ক্ষোভ নিয়ে।
সন্ধ্যায় রায়ে জয়ী পক্ষের একজন টঙের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন।
হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে তাকে ঘিরে ধরল।
চায়ের কাপটি হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল।
আর কিছুক্ষণ পরে তার মাথাহীন দেহ পড়ে রইল রাস্তার ধারে।
পরদিন গ্রামের মানুষ জানল—একজন ব্রাজিল সমর্থক নিহত হয়েছে। নিহতের ছোট্ট ছেলে জানল—তার বাবা আর বেঁচে নেই।
সংবাদপত্রে কয়েকদিন খবর বেরোল।
তারপর আর কেউ খোঁজ নিল না।
ব্রাজিল পরের ম্যাচে জিতল।
আর্জেন্টিনাও জিতল।
নতুন নতুন মিছিল বের হলো।
নতুন নতুন পতাকা উড়ল।
শুধু নিহত মানুষটির স্ত্রী মানুষের বাড়িতে কাজ নিতে শুরু করলেন।
ছেলেটি স্কুল ছেড়ে বাজারে বোঝা টানতে লাগল।
একদিন বৃদ্ধ লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
—বাবা, তুমি ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?
ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আমি জানি না।
—তাহলে কোন দলের?
ছেলেটি দূরে উড়তে থাকা পতাকাগুলোর দিকে তাকাল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
—আমি বাবার দলের ছিলাম।
বৃদ্ধ লোকটির চোখ ভিজে উঠল।
কারণ তিনি হঠাৎ বুঝতে পারলেন—
যে মানুষটার মৃত্যুতে একটি পরিবার ভেঙে গেল, একটি শিশু এতিম হয়ে গেল, একটি জীবনের ভবিষ্যৎ বদলে গেল—
ব্রাজিলে তার খবর কেউ জানল না।
আর্জেন্টিনাতেও না।
শুধু তার ছেলেটি আজও জানে,
একটা খেলার শেষে তার বাবা আর বাড়ি ফেরেনি।
লেখক পরিচিতি
সালেক উদ্দিন-এর জন্ম ২৬ মে ১৯৬০ সালে। তিনি বাংলাদেশের একজন কথাসাহিত্যিক। তিনি একাধারে গল্পকার, নাট্যকার, কবি, গীতিকবি, সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তাকে জনপরিসরে আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে সক্রিয়। বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সমকালীন রাজনীতি, নীতিবিশ্লেষণ ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মেও তিনি গল্প ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। বাংলা একাডেমীর জীবন সদস্য এই লেখকের পূর্বে প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ পাঠকমহলে সমাদৃত।
