কাকবন্ধ্যা, লেখক - নুরুল হাসান

কাকবন্ধ্যা, লেখক - নুরুল হাসান
গল্পঃ কাকবন্ধ্যা
লেখকঃ নুরুল হাসান


“ডাক্তারবাবু, তিন বছর বিয়ে হয়েছে। সন্তান-সন্ততি হচ্ছে না। কী করি বলেন তো? লোকে আমার বৌকে কত রকম দোষারোপ করছে।”

ডাক্তার আরিফের সামনে বসে কথাগুলো বলছিলেন বছর তিরিশের এক যুবক। তাঁর পাশে জড়সড় হয়ে বসে আছেন কুড়ি বছরের এক তরুণী স্ত্রী। ডাক্তার আরিফ পেশায় চিকিৎসক হলেও মানুষ চিনতে ভুল করেন না। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “দেখুন, এখনই বলা মুশকিল কার সমস্যা। একটা ছোট পরীক্ষা করাতে হবে, তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।”

যুবকটি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “বউয়ের টেস্ট?”

আরিফ সাহেব তাঁর স্বভাবজাত শান্ত স্বরে বললেন, “বউয়ের টেস্ট করালে প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ। তার চেয়ে বরং আপনি নিজের পরীক্ষাটা করান, মাত্র তিনশ টাকায় হয়ে যাবে।”

কথাটা শুনে যুবকটি যেন তেড়েফুঁড়ে উঠল। পুরুষত্বের অহংকারে আঘাত লাগায় সে কর্কশ স্বরে বলল, “বলেন কী ডাক্তারবাবু! আমার মতো জোয়ান মরদের আবার বাচ্চা হতে অসুবিধা?”

ডাক্তার আরিফ মুচকি হেসে পরিস্থিতি সামাল দিলেন। “আরে না, আপনার টাকাটা বাঁচানোর জন্যই বললাম। আপনার সমস্যা না থাকলে তো সোজা হিসেব—বউয়েরই সমস্যা। তাই না?”

টাকার কথা শুনে যুবকের ইগো কিছুটা শান্ত হলো। সে সস্ত্রীক বেরিয়ে গেল। স্ত্রী বেচারি কোনো কথা না বলে নীরবে স্বামীর আজ্ঞা মেনে পিছু নিল।

কয়েকদিন পর যুবকটি রিপোর্ট নিয়ে চেম্বারে হাজির। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, “এই দেখুন রিপোর্ট। বলেছিলাম না, আমার কোনো সমস্যা থাকতে পারে না!”

আরিফ সাহেব শান্ত মাথায় রিপোর্টটি দেখলেন। তারপর যুবকের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বললেন, “দেখুন, আপনার সিমেনে স্পার্ম নেই। আপনি কোনোদিন বাবা হতে পারবেন না।”

যুবকটি বিস্মিত হয়ে বলল, “কী বললেন? বুঝতে পারলাম না।”

ডাক্তার বললেন, “বলছি কী, আপনার বীর্যে শুক্রাণু—মানে বীজ—নেই। আপনি বাবা হতে পারবেন না।”

ডাক্তারের কথা শুনে যুবকটি উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে বলল, “রাখেন আপনার ডাক্তারি! একরাতে যে পাঁচবারেও ক্লান্ত হয় না, সে নাকি বাপ হতে পারবে না? অসম্ভব!”

রাগে গজগজ করতে করতে সে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। ডাক্তার আরিফ শুধু তাঁর চিরচেনা রহস্যময় হাসি নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন।

এর মধ্যে চার-পাঁচ মাস কেটে গেছে। তারাও আর আসেনি। বিভিন্ন রোগীর ভিড়ে ডাক্তার আরিফও বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলেন।

হঠাৎ একদিন সেই যুবক সস্ত্রীক হাজির। তবে আজ তার চোখেমুখে দম্ভ আর বিজয়ের হাসি।

টেবিল চাপড়ে সে বলল, “এই যে ডাক্তারবাবু, কী বলেছিলেন মনে আছে? আমি নাকি বাপ হতে পারব না! এই দেখুন, আমার স্ত্রী তিন মাসের পোয়াতি। এমনি এমনি হয়নি, আয়ুর্বেদিক ওষুধের কেরামতি। তিন-চার হাজার টাকা খরচ করেছি।”

ডাক্তার আরিফ একপলক মহিলার দিকে তাকালেন। দেখলেন ভয়ে আর লজ্জায় তরুণীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আরিফ সাহেব পরিস্থিতি বুঝে নিলেন।

তিনি বললেন, “তাহলে তো আনন্দের সংবাদ। তাহলে আমার কাছে আর আসা কেন?”

যুবকটি বলল, “আমি তো আসতে চাইনি। বৌ বলল, চল ডাক্তারকে দেখিয়ে নিয়ে আসি। কীসব ওষুধ খেলে ছেলে নাকি পুষ্ট হয়।”

গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন আরিফ সাহেব। “তাহলে এই আনন্দে একটা সিগারেট হয়ে যাক কী বলেন? সিগারেট খান তো?”

যুবকটি হেসে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ।”

ডাক্তার আরিফ পকেট থেকে টাকা বের করে যুবকটির হাতে দিলেন। “যান, এক প্যাকেট ফ্লেক নিয়ে আসুন। আপনার এই খুশিকে সেলিব্রেট করি।”

যুবকটি গদগদ হয়ে বাইরে যেতেই আরিফ সাহেব মহিলার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। মহিলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কাঁপা গলায় বললেন, “ডাক্তারবাবু, সংসার বাঁচানোর আর কোনো উপায় ছিল না। না হলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিত, সতীন নিয়ে আসত। গরিবের মেয়েকে কে দেখবে বলুন?”

আরিফ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর অভিজ্ঞ চোখ সব বুঝে নিয়েছে। তিনি সান্ত্বনার সুরে বললেন, “শোনো, যা করেছ একবারই। আর কখনো এমন কোরো না। তাকেও সতর্ক করে দিও।”

ইতিমধ্যে যুবকটি সদর্পে ফিরে এল। আরিফ সাহেব একটা সিগারেট ধরিয়ে বাকিটা যুবকের হাতে দিয়ে বললেন, “আপনি ঠিকই বলেছিলেন, আপনার কোনো দোষ নেই। আসলে আপনার স্ত্রী ‘কাকবন্ধ্যা’। মানে, ওঁর জীবনে একবারই সন্তান হবে, আর কখনো হবে না।”

যুবকটি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে মাথা নাড়ল। বিজয়ী হাসি হেসে বলল, “একটাই যথেষ্ট ডাক্তারবাবু, কিন্তু প্রমাণ তো হলো যে আমি পারি!”

আরিফ সাহেব জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসলেন। বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে।


লেখক পরিচিতি

কবি ও লেখক নুরুল হাসান-এর জন্ম ১৯৮১ সালে মুর্শিদাবাদ জেলায়। বর্তমান নিবাস মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘিতে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ (শিয়ালদহ) থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে স্নাতক। পরে গুরু ঘাসিদাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএমডি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে এমএসসি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োইনফরমেটিক্সে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। বর্তমানে পাথরডাঙা ওসমানিয়া হাই মাদ্রাসায় জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

নিজের আনন্দের জন্যই তাঁর লেখালেখি। লেখার হাতেখড়ি বাবার হাত ধরে। তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ‘কণ্ঠস্বর’ নামের একটি লিটল ম্যাগাজিনে। ২০১১ সালে সাহিত্যিক সুদীপ জোয়ারদারের সঙ্গে পরিচয়ের পর সাহিত্যচর্চায় নতুন করে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন স্থানীয় লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বের অস্থিরতা এবং মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ তাঁর সৃষ্টিশীল মননে গভীর প্রভাব ফেলে। সেই অনুভব থেকেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বাঁচার বর্ণমালা’, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘একদিন বৃষ্টিতে এসো’ এবং প্রথম উপন্যাস ‘ব্যাবিলনের পাখি’

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url