প্রবন্ধ - উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস, লেখক - ড. মনোরঞ্জন দাস
উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস
( ৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস স্মরণে )
ড. মনোরঞ্জন দাস
খেলাধুলা শান্তি, অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উন্নয়ন ও শান্তি দিবসের মূল বিষয়বস্তু হবে 'ক্রীড়া: সেতুবন্ধন, প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ', যা ক্রমবর্ধমান খণ্ডিত বিশ্বে সংযোগ, অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ক্রীড়ার অনন্য সক্ষমতাকে তুলে ধরবে।
সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সীমানা ঊর্ধ্বে এক সার্বজনীন ভাষা হিসেবে খেলাধুলা সামাজিক রূপান্তরের এক শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। খেলাধুলা বিভিন্ন সীমান্ত ও প্রজন্মের মানুষকে একসূত্রে গাঁথে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতা কমায় এবং সংলাপ, সংহতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ক্ষেত্র তৈরি করে। কবি শংকর সরকার তার ' খেলা ধুলো' কবিতায় লেখেন,
'দেহে শক্তি জাগে খেলার ছন্দে,
ঘামের ফোঁটা ঝরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
খেলার ভেলায় ভেসে মন পায় শান্তি,,
ভাবনারা মুছে দেয় জীবনের ক্লান্তি ।
খেলাধুলা শেখায় শৃঙ্খলা, ধৈর্য,
জীবনকে গড়ে তোলে সম্প্রীতির রাজ্য।
আত্মবিশ্বাস জাগায় মনের সুপ্তিতে,
জীবন বেঁচে থাকে খেলা ধুলোর তৃপ্তিতে।
জীবনের মন্ত্র হোক খেলা ধুলোর উত্তরণ,
যুবক হোক বৃদ্ধ হোক খেলা হোক সম্পূরণ।'
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক দিবসটি প্রমাণ-ভিত্তিক পন্থা এবং সর্বোত্তম অনুশীলনসমূহকে তুলে ধরবে, যা প্রদর্শন করবে কীভাবে খেলাধুলা ২০৩০ প্রকৃত উন্নয়ন এজেন্ডায় পরিমাপযোগ্যভাবে অবদান রাখে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, বৈষম্য হ্রাস এবং শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে। সংলাপ, অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, আইডিএসডিপি ২০২৬ মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি এবং অন্তর্ভুক্তির প্রতিবন্ধকতা দূর করার একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে খেলাধুলার ভূমিকাকে পুনঃনিশ্চিত করবে, যেখানে কাউকেই পেছনে ফেলে রাখা হবে না।
ফ্রান্স প্যারিস ২০২৪ দৃঢ় উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করেছে। এর পটভূমি, এর ব্যাপক বিস্তৃতি, অতুলনীয় জনপ্রিয়তা এবং ইতিবাচক মূল্যবোধের ভিত্তির কারণে, জাতিসংঘের উন্নয়ন ও শান্তি বিষয়ক উদ্দেশ্য পূরণে অবদান রাখার জন্য খেলাধুলা এক আদর্শ অবস্থানে রয়েছে।
এই সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৬ এপ্রিলকে ‘উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস’ (IDSDP) হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিবসটি গ্রহণ করার মাধ্যমে মানবাধিকারের অগ্রগতি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্রীড়ার যে ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে, সে বিষয়ে জাতিসংঘের ক্রমবর্ধমান স্বীকৃতি সূচিত হয়।
দিবসটি প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাবে, সাধারণ পরিষদ , রাষ্ট্রসমূহ, জাতিসংঘ ব্যবস্থা এবং বিশেষ করে, উন্নয়ন ও শান্তির জন্য ক্রীড়া বিষয়ক জাতিসংঘ কার্যালয়, প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, এবং আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাসমূহ, বেসরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাতসহ সুশীল সমাজ, এবং অন্যান্য সকল প্রাসঙ্গিক অংশীজনকে উন্নয়ন ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস উপলক্ষে সহযোগিতা, পালন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই প্রিয়ময় অনুসঙ্গে বিশ্বকাপকে মনে রেখে কবি ইলা দাস 'সানি' কবিতায় লেখেন,
''সানি' ভীষণ ব্রেনি ছেলে
চালাক ও ফাজিল
সবার আগে বলল সে
কাপটা নেবে ব্রাজিল।।
সানির কথায় মুখখানা হয়
রাণা রাজা, পানসে
ভেবেই ছিল কাপটি এবার
যাবেই বুঝি ফ্রান্সে।।
ওদিক থেকে কেষ্ট- বিষ্টু,
আমরা তো সব জার্মানি
যতই হোক গোল চারটে,
তবু, হার কি আমরা মানি?
ওই দেখো ওই মুখ লুকিয়ে
কাঁদছে বসে রীণা
এমন করে ছিটকে কেন
গেল আর্জেন্টিনা ?'
খেলাধুলার প্রতি মূল্যবোধের শক্তি,মানুষকে একত্রিত করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উদ্যোগে খেলাধুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যুবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসগুলি হল :ক. ১৬ মে বিশ্ব ফেয়ার প্লে দিবস ; খ.১৯ মে বিশ্ব ফুটবল দিবস; গ. ২৫ মে বিশ্ব সাইকেল দিবস; ঘ. ৩ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস; ঙ.২১ জুন আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস; চ .২০ডিসেম্ব বাস্কেটবল দিবস।
শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে খেলাধুলা একটি সাশ্রয়ী ও বহুমুখী মাধ্যম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। শক্তিশালী উন্নয়নের ২০৩০ কর্মসূচিতে সামাজিক অগ্রগতিতে খেলাধুলার ভূমিকাকে আরও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে,'খেলাধুলা শক্তিশালী উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়কও বটে। আমরা সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধের প্রসারের মাধ্যমে এবং নারী ও তরুণ প্রজন্ম, ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য অর্জনে খেলাধুলার ক্রমবর্ধমান অবদানকে স্বীকার করি।' খেলার গুরুত্ব সম্পর্ক মোঃ ইজাজ আহামেদ তার' খেলা' কবিতায় লেখেন,
'খেলা, তুমি মনের আনন্দ;
খেলা, তুমি শরীরের প্রতিষেধকও;
শেখাও তুমি শৃঙ্খলা,
শেখাও নিয়মে চলা;
শেখাও নেতৃত্ব দিতে,
শেখাও সৎপথে চলতে;
শেখাও কর্মঠ হতে,
শেখাও উদার হতে,
শেখাও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে,
শেখাও সম্প্রীতি বজায় রাখতে।
বিকেলের মিষ্টি আলোর আভায়
পায়ের ঢেউ উঠে ঘাসের ডগায়।
বাতাসে ভাসে কত দর্শকদের চিৎকার!
খেলোয়াড়দের বুকে উঠে কত আনন্দের জোয়ার!
বাতাস কানে কানে বলে জয়-পরাজয়ের বার্তা;
মাটি তার পাণ্ডুলিপিতে লিখে ইতিহাসের কথা।
সূর্যের বিদায়ী ডানায় সন্ধ্যা আসে,
তবু শিশুরা তোমায় ছেড়ে যায় না মায়ের পাশে।
খেলা, অনেকে মুগ্ধ তোমার অনেক সাজে;
আমি মুগ্ধ থাকি তোমার ক্রিকেটে মজে।'
ফুটবল ফর দ্য গোলস (FFTG) হলো জাতিসংঘের সদস্য-ভিত্তিক একটি উদ্যোগ, যা বিশ্ব ফুটবল সম্প্রদায়কে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে এবং এর পক্ষে সমর্থন জানাতে একটি মঞ্চ প্রদান করে। এটি ফুটবলের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রভাবকে কাজে লাগানোর এবং ফুটবল সংস্থাগুলোর জন্য এসডিজি-র আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাদের বার্তা, কৌশল ও কার্যক্রমকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার মাধ্যমে পরিবর্তনের বাহক হিসেবে একসঙ্গে কাজ করার একটি সুযোগ। এ প্রসঙ্গে কবি জসিম উদ্দিন-এর একটি কবিতা ,
'আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়
হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে তার।
সন্ধ্যাবেলায় দেখিবে তাহারে পটি বাঁধি পায়ে হাতে,
মালিশ মাখিছে প্রতি গিঁটে গিঁটে কাত হয়ে বিছানাতে।
মেসের চাকর লবেজান সেঁকে দিতে ভাঙা হাড়ে,
সারারাত ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে।
................
প্রভাত বেলায় খবর লইতে ছুটে যাই তার ঘরে,
বিছানা তাহার শূন্য পড়িয়া ভাঙা খাটিয়ার পরে।
......................
সকালে সকালে দৈনিক খুলি
মহা-আনন্দে প'ড়ে,
ইমদাদ হক কাল যা খেলেছে, কমই তা নজরে পড়ে।'
এই উদ্যোগটি তৃণমূল ক্লাব ও এনজিও থেকে শুরু করে পেশাদার লীগ ও আন্তর্জাতিক কনফেডারেশন পর্যন্ত ফুটবল জগতকে বিদ্যমান মুক্ত পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে আচরণগত পরিবর্তন আনতে পারে এমন এসডিজি-সম্পর্কিত কৌশল বাস্তবায়নে অনুপ্রাণিত ও পথনির্দেশ করে। সদস্যরা তাদের পরিচিতি ও প্রচার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে প্রচারণার মাধ্যমে এসডিজি-র গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক দিবস ও সপ্তাহগুলো হলো উদ্বেগজনক বিষয় সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা, বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সম্পদ একত্রিত করা এবং মানবজাতির অর্জনকে উদযাপন ও সুদৃঢ় করার উপলক্ষ। আন্তর্জাতিক দিবসের অস্তিত্ব জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠারও পূর্ববর্তী, কিন্তু জাতিসংঘ এগুলোকে একটি শক্তিশালী প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। খেলাধূলার গুরুত্বের সম্পূরকে রেখে একটি সনেট দিয়ে শেষ করি,
' শান্তি আর সুনিবিড় সম্পর্ক গঠনে
খেলাকে অনন্য এক সম্পূর্ণ অধ্যায়ে
আনো, আনো সুনির্মল, নিত্য প্রচলনে,
যেন সবাই ভাতৃত্ব বন্ধনে থাকে হে।
সার্বিক অর্পণে জেনো তোমারও প্রিয়
প্রত্যয়গুলো নিপূণ সরলপ্রবাহে
প্রার্থনার মতো ঠিক দৃপ্ত বরণীয়
হবে অর্জনে আবার, রবেই সমূহে।
প্রচারের হাতিয়ার হোক খেলাধূলা,
যেন সকলেই শুদ্ধ আত্মীয়তা মাঝে
একাকার হয়, হয় ঋদ্ধ সারাবেলা;
নির্মানে সবাই রবো শক্তিময় কাজে।
উদ্যোগে খেলায় সবে আন্তর্জাতিকতা
মাঝে সমাহারী হই, আনি সক্রিয়তা।'
