অনুগল্প: মুক্তি, লেখক - আব্দুল মালেক

 


মুক্তি 
আব্দুল মালেক

অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরো একবার নোটটা পকেট থেকে বের করে ফেললাম । একটা চকচকে পাঁচশো টাকার নোট। একবার প্যান্টের পকেট, একবার জামার পকেট, একবার হাতে ব্যবহারের ফলে কিছুটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। কয়েকদিন থেকে আমার শরীরে আঠার মতন লেপ্টে আছে। এখনো কোনো তার সদগতি করে ওঠা গেল না বা মুক্তি দেওয়া গেল না। 

সেদিন হাজার চেষ্টা করেও সন্ধ্যার আগে আগে নদীর ঘাটে ফেরা সম্ভব হলো না ।  রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ হওয়ার কারণে সন্ধ্যা পেরিয়ে ঘন অন্ধকার নেমে এল। চারিদিকে মহিষের মতো কালো অন্ধকার ঘাপটি মেরে বসে আছে। কোথাও আলোর দেখা নেই। সেই অন্ধকারেই দেখা গেল নদীর ঘাটেএকটা নৌকা বাঁধা আছে।লোকজন কেউ নেই। আমি বাইকটা স্টার্ট দিয়ে নৌকায় নেমে পড়লাম। আমার পরে পরেই আরো দু চারজন  আরোহী নৌকায় উঠে পড়ল

 এইমাত্র  লাইনটা  এলো। নদীর ধারের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠল। আমি বাইকের উপর চেপে আছি । এবং এদিক অধিক চোখ চালিয়ে দেখছি। হঠাৎই দেখতে পেলাম আমার পায়ের কাছে একটা কাগজ চকচক করছে। আমি কোন কিছু খোঁজার একটা বাহানা করে কাগজটা তুলে ফেললাম। দেখি একটা পাঁচশো টাকার চকচকে নোট। কার পকেট থেকে পড়ে গেছে জানিনা। ভাবলাম একবার বলি বা খোঁজ করি নোট মালিকের। কিন্তু আমার মন কোনমতেই সায় দিল না। কারণ নৌকার উপর যারা আছে তারা তো এইমাত্র এলো।  যদি বলি হয়তো এদের মধ্যে কেউ নোটটা আমার বলে  টাকাটা হাতিয়ে নিবে। আমি চুপচাপ নোটটা নিয়ে নৌকায় স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলাম। নদী পার হয়ে এপারে চলে এলাম। 

নোটটার কথা আর কাউকে কিছু বলা হলো না। আমার পকেটেই থেকে গেল। ভাবলাম সময়মতো উপযুক্ত পাত্র দেখে কাউকে দিয়ে দেব। 
হঠাৎই একটা এত বড় সংসার নিয়ে অথই জলে পড়ে গেলাম। দিন আর চলেনা। চোখের সামনে ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো খাওয়ার জন্য বায়না করছে। পয়সা চাইছে । আমি সেই আবদার তাদের পূরণ করতে পারছি না। চোখের সামনে ওদের বিবর্ণ মুখ মলিন চেহারা আমার ভেতরটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে

সেদিন ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের অনাহার ক্লিষ্ট চেহারা আর সহ্য হলো না । বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সারাদিন এখানে ওখানে বাউন্ডুলের  মতো ঘুরলাম। পথের ক্লান্তি পেটের খিদের জ্বালায় আর চলতে পারছি না। এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। একটা গাছের নিচে ধপাস করে বসে পড়লাম ।আমার প্যান্টের পকেটে পাঁচশো টাকার নোটটা তখনও বহাল তবিয়তে আছে ।বসে বসে ভাবতে লাগলাম । শেষে দেখলাম পাঁচশো টাকার নোটটার উপযুক্ত প্রার্থী আমার মতো আর কাউকে চোখে পরলোনা না। যেই ভাবা সেই কাজ আমি  টাকাটার আজকে একটা সদগতি করে ফেললাম। পাঁচশো টাকার নোটটাকে মুক্তি দিয়ে দিলাম।  নতুন করে বুকে বল ফিরে পেলাম । হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ফিরতি পথে বাজার থেকে সংসারের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাড়ির পথে হাঁটা দিলাম।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url