তোমাকে ভালোবাসা যায় না, কলমে - সালেক উদ্দিন
তোমাকে ভালোবাসা যায় না
সালেক উদ্দিন
অষ্টাদশী কাব্য মধ্যবয়সী এক কবিকে ভালোবাসে—দুটি কারণে।
প্রথম কারণটি ছিল কবির উচ্চারণ করা এক দর্শন। কবি বলেছিলেন—প্রকৃত ভালবাসা হলো প্রত্যাশা মুক্ত।
ভালোবাসা প্রতিদান যা দেওয়ার এমনিতেই দেয়।
ভালোবাসার কাছে কোনো প্রত্যাশা থাকতে নেই।
প্রত্যাশা এলে ভালোবাসা সরে যায়,
প্রত্যাশা গভীর হলে ভালোবাসা ভেঙে যায়।
কাব্য মুগ্ধ হয়ে শুনেছে সেই কথা ।
দ্বিতীয় কারণটি ছিল একটি গল্প। একদিন গল্পের ছলে কবি বলেছিল—
প্রাচীন গ্রীসে এক চিত্রশিল্পী অষ্টাদশী তরুণীর নগ্ন চিত্রএঁকে বিচারের মুখোমুখি হয়। সবাই চিত্রটিকে অশ্লীল বলে নিন্দা করে।
শিল্পী তখন তরুণীর নগ্ন চিত্রের এক পায়ে মোজা এঁকে দেয়।
তারপর বলে—
“ আগে চিত্রটি অশ্লীল ছিলনা, এখন অশ্লীল হলো”
পূর্ণিমার রাত, কবির বাড়ির ছাদে কাব্য কবির বর্ণনার সেই নির্ভীক, নির্মল, চিত্রের অষ্টদশীর মতো নিজেকে মেলে ধরে একাকী গান গাইছে। হঠাৎ কবি এসে দাড়ায় মুখোমুখি।
জ্যোৎস্নায় ভেসে আসে প্রশ্ন—
“বল কবি—কে বেশি সুন্দর,
জোৎস্না না কাব্য?”
কবির চোখ আকাশ থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসে কাব্যের শরীরে—
দৃষ্টি বদলে যায়, ভারী হয়, থেমে থাকে।
সেই দৃষ্টির ভেতর কাব্য পুড়ে যায় যন্ত্রণায়। কাব্যের বাধা কবিকে থামাতে পারেনা।
দর্শন সরে যায়,
থেকে যায় শরীরের অনুচ্চারিত দাবি,
নিঃশব্দ এক প্রত্যাশা।
রাত শেষ হয়। কবির যখন ঘুম ভাঙে
তখন কাব্য আর সেখানে নেই।
তার জায়গায় পড়ে আছে একটি ছোট্ট চিরকুট—
“প্রত্যাশার বলয় থেকে বের হতে পারলে না, কবি।
যে আগুনে অন্যেরা পোড়ে,
সেই আগুনে তুমিও পুড়েছো ।
তোমাকে ভালোবাসা যায় না।”
---------------------
লেখক পরিচিতি : সালেক উদ্দিন (জন্ম: ১৯৬০) একজন কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, কবি, কলামিস্ট ও জনবুদ্ধিজীবী। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা ও সাহিত্য প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির একজন জীবন সদস্য। তাঁর রচনা ব্যক্তি-জীবন ও সামষ্টিক বাস্তবতার অন্তর্লীন টানাপোড়েনকে অনুসন্ধান করে। কথাসাহিত্য, কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধে তিনি স্মৃতি, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নগুলোকে গভীরভাবে অন্বেষণ করেন।
