মোঃ ইজাজ আহামেদ - এর যুদ্ধ বিরোধী কিছু কবিতা
বারুদের গন্ধে অসহায় কান্না
মোঃ ইজাজ আহামেদ
অস্থিরতার জীবাণুরা দু'বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরছে অসুস্থ বিশ্বটাকে
রক্ত পিপাসু হিংস্র যুদ্ধরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশে দেশে
অনেককে নিয়ে যাচ্ছে না ফেরার দেশে
ভস্মীভূত অট্টালিকার ছাইস্নাত বাতাস বারুদের গন্ধ মাখছে দেহে
বিষাক্ত ধোঁয়ায় আকাশের চোখ থেকে অশ্রু পড়ছে গড়িয়ে
রক্তের নদী প্লাবিত করছে মরুভূমিকে
আশ্রয় খুঁজছে অসংখ্য অসহায় চোখ
আকাশের পথে মেঘেরা বাতাসের হাত ধরে হাঁটছে
নিচে স্বপ্নের হাত ধরে হাঁটছে শরণার্থীরা
ধ্বংসস্তূপে বসে আছে অসংখ্য অসহায় কান্না
আকাশের ছাদের নিচে মাটির আঙিনায় শুয়ে আছে নিঃস্বরা
তারা তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে
ব্যস্ত যুদ্ধযানেরাও বোমার বৃষ্টি বর্ষণ করতে করতে
মনে হয় আজ ক্লান্ত
ব্যস্ত শহর কঙ্কাল শরীর নিয়ে আজ নিঃসঙ্গ রাস্তায় শুয়ে আছে একা
ভাঙ্গা কার্নিশে ঝুলছে সোনালী অতীত
উপত্যকায় ঈদের চাঁদ
মোঃ ইজাজ আহামেদ
আমরা গাজাবাসী,
আমাদের উপত্যকায় ঈদের চাঁদ ঝিমায়,
সে আনন্দ নিয়ে আসে না,
আমরা বেঁচে থেকেও মরে গেছি
মনের আঙিনায়,
নির্মম হত্যার অকাল মৃত্যু সর্বদাই চোখ রাঙায়,
আমাদের কাছে ঈদের খুশি আসে না,
বাড়ির কঙ্কালগুলিতে বসে তাকিয়ে আছি অসহায় বিস্ময় চোখে
উদাসী ধূসর সন্ধ্যার আকাশের দিকে,
বাতাস শুঁকে শুঁকে যাচ্ছে বারুদের ঘ্রাণ
আর আলিঙ্গন করছে হাজার হাজার আর্তনাদ,
গোধূলির দুঃখিত আলো লুটিয়ে পড়ছে পবিত্রভূমির কঙ্কালগুলিতে,
ঈদের একফালি চাঁদ তন্ন তন্ন করে খুঁজছে ক্ষতহীন এক টুকরো ঘর;
না নেই, সব রক্তাক্ত ধ্বংসস্তূপ, লাল মানচিত্রে ঈদ ঢুকরে ঢুকরে কাঁদছে,
সোনালী অতীত আর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ উঁকি মারছে ভাঙ্গা কার্নিশে।
বিশ্বটা
মোঃ ইজাজ আহামেদ
বিশ্বটা হয়ে উঠেছে অস্ত্রের কারখানা;
আকাশে বাতাসে অনুরণন হচ্ছে অস্ত্রের দামামা;
ভুবনে চলছে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
সর্বত্রই ভেসে আসছে বারুদের ঘ্রাণ;
চলছে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা,
চলছে সমরাস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা;
মানুষের জীবনের নেই কোন মূল্য,
নির্বিচারে হচ্ছে হত্যা,
দুর্বলদের বেঁচে থাকতে নেই যেন;
কিছু মানুষ শান্তি চায়না, যুদ্ধ চায় কেননা
যুদ্ধে তাদের ব্যাবসা বাড়ে, অর্থ আসে, শান্তিতে অর্থ আসে না;
মুখোশের আড়ালে
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল উদ্দেশ্য লুকিয়ে;
আধিপত্য কায়েম করার প্রতিযোগিতা বিশ্বজুড়ে;
ধর্মের সুড়সুড়ি একটি মিথ্যা ফানুস, উড়ে চলেছে আকাশ জুড়ে;
বিশ্বজুড়ে বিরাজিত পুঁজিবাদের আবহাওয়া,
ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে পরিণত হচ্ছে জলবায়ুতে তারা।
দূর্বলদের যেন কোন দেশ নেই
মোঃ ইজাজ আহামেদ
খনিজ সম্পদে ভরপুর মধ্যপ্রাচ্যের করুন অবস্থা
আমাকে দেয় খুব ব্যাথা
সাম্রাজ্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি বসাচ্ছে থাবা,
শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ,
ষড়যন্ত্রের যাঁতাকলে মধ্যপ্রাচ্য।
অনেক নারী হচ্ছে বিধবা,
অনাথ হচ্ছে অনেক শিশু, লুট হচ্ছে তরল সোনা;
একের পর এক হচ্ছে জমি দখল;
তাদেরকে এইসব মানতেই হবে, তারা নয় যে সবল;
যেন তাদের কোনো অধিকার নেই,
যেন তাদের কোনো দেশ নেই।
উন্নত দেশের মুখে মানবতার মিথ্যা ফানুস;
হ্যাঁ এটাই সত্যি,
তারা তো সাম্রাজ্যবাদী,
মানবতার মুখোশধারী,
মুখোশের আড়ালে স্বার্থের ছড়াছড়ি।
পুরো পৃথিবীটা যেন কয়েকটা দেশেরই,
চলতে হবে সবাইকে তাদের নিয়মেই;
তারা যাকে ইচ্ছে জঙ্গী-সন্ত্রাসবাদী বলবে,
যাকে ইচ্ছে নিষেধাজ্ঞা দেবে,
অস্ত্র বিক্রি করবে।
তারা যুদ্ধ চায়, শান্তি চায়না,
কেননা শান্তিতে যে অর্থ আসে না।
ফিলিস্তিনি
মোঃ ইজাজ আহামেদ
আমি ফিলিস্তিনি,
আমি নিজ দেশেই পরবাসী,
প্রায় সারাবছর বারুদের গন্ধ বাতাসে মিশে,
স্বজন হারার কান্নার রোল আকাশে ভাসে,
আমার দেশ আজ আর নেই বড়ো,
হিংস্র দখল নেওয়া হয়েছে, এখন ছোট ভূমি,
আমি অবরুদ্ধ।
পবিত্রভূমি অত্যাচারিত।
নিষ্ঠুর হামলা, নিষ্ঠুর বর্বরতা তাড়া করছে;
পা বাড়াচ্ছি কাঁটাতারের বেড়ায়
এক আকাশ অন্ধকার মাথায় নিয়ে,
স্বজন হারার এক পৃথিবী দুঃখ হৃদয়ে নিয়ে,
পরাধীনতার গ্লানি মাথায় নিয়ে;
বাঁচার এক টুকরো স্বপ্ন ঘাড়ে নিয়ে চলেছি এগিয়ে;
বিশ্ব শুধু দেখছে নীরব নয়নে;
আমি শরণার্থী,
আমি শরণার্থী।
আমার প্রতিবাদ মৃত্যু পর্যন্ত চলবে,
নিজ দেশে বেচেঁ থাকার লড়াই সারাজীবন চলবে,
আমার যুদ্ধ দখলদারির বিরুদ্ধে কেয়ামত পর্যন্ত চলবে,
আমার বিশ্বাস ইনশাল্লাহ আমি একদিন জিতব,
নিজ দেশেই বাঁচবো।
লোলুপ দৃষ্টি
মোঃ ইজাজ আহামেদ
লোলুপ দৃষ্টিরা উঁকি মারে দেশে দেশে,
না সব দেশে নয়, তৃতীয় বিশ্বে,
তারপর শকুনের মতো
কিংবা জোঁকের মতো
নিজেদের পুষ্টি জোগায়।
এই অভিপ্রায়
বাড়িয়ে দিয়েছে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা,
এই অভিপ্রায়
প্রথম বিশ্বকে চাপ দিয়েছে উপনিবেশ গঠন করতে
আর ঔপনিবেশিক শাসনের রোলারে পিষে
মার খেয়েছে অধিবাসীরা;
এখনও অব্যাহত রয়েছে কিছু দেশে।
স্নায়ু যুদ্ধ শেষে পরমাণু আর এখন চলছে
মিশাইল ও ড্রোনের প্রতিযোগিতা;
প্রথম বিশ্ব ও দ্বিতীয় বিশ্বের রেষারেষি;
পৃথিবীটা যেন হয়ে উঠছে অস্ত্রের কারখানা
আর মধ্যপ্রাচ্য অস্ত্র পরীক্ষার ল্যাবরেটরি।
তারা হাঁটছে
মোঃ ইজাজ আহামেদ
আকাশে তারারা হাঁটছে
নীচে হাঁটছে শরণার্থীরা
এক পৃথিবী দুঃখ নিয়ে
একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে তারা
বিস্ময় ভরা নয়নে
মৃদুমন্দ বাতাসের হাত ধরে জ্যোৎস্না হাঁটছে
কাঁটাতারের বেড়ায় কিংবা জলসীমায় পা বাড়াচ্ছে শরণার্থীরা
এক টুকরো স্বপ্ন সাথে নিয়ে
একটু সুখী-জীবনের স্বাদ পেতে কিংবা
প্রাণহানির তাড়া থেকে বাঁচতে
সীমান্তরেখায় আটকে পড়ছে অনেকে
অনেকে আবার গুলিবিদ্ধ হচ্ছে কিংবা
সলিল-সমাধি জোর করে তাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে
সহস্র আলোকবর্ষ-পথ অতিক্রম করে তারা
পাড়ি দিচ্ছে অকালে না ফেরার দেশে
শরণার্থী
মোঃ ইজাজ আহামেদ
মাথায় স্বপ্নের বোঝা নিয়ে
শরণার্থীরা এগিয়ে যাচ্ছে,
ইতিহাস পিছনে দেখছে
আর তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে
তাদের অসংখ্য অসহায় জীবনচিত্র,
তারা স্বপ্ন দেখেছিল নিজ দেশে
সুখের নীড় তৈরি করতে,
শান্তিতেও ছিল, ঝড়ের মতো হটাৎ করে যুদ্ধ এলো
আর অনেকের জীবন কেড়ে নিল,
অনেককে নিঃস্ব করে দিল,
অনেককে পথের ভিখারি বানিয়ে দিল,
তাদের ভবিষ্যতকে চোরের মতো পেটানো হল;
তাদের ইচ্ছা, আশা, স্বপ্ন কাঁচের মতো চুরমার হয়ে গেল
তবু একটু বাঁচার জন্য পিঁপড়ের মতো লাইন ধরে
কাঁটাতারের বেড়ার দিকে এগিয়ে চলেছে
আর মাটির বুকে দূর্বিষহ জীবন-ইতিহাস লিখে যাচ্ছে;
হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে, দাঁড়াতে হয় উঠে;
রক্তাক্ত জীবন নিয়ে তারা সেটাই করার চেষ্টা করছে;
কাঁটাতারে, জলসীমায় মার খেতে হচ্ছে
যেন এই নীল গ্রহে তাদের কোনো ঠাঁই নেই,
যেন তাদের কোনো দেশ নেই।
