নাটক: মসজিদের মৃত্যু, কলমে - মোঃ দাউদ হোসেন
মসজিদের মৃত্যু
মোঃ দাউদ হোসেন
চরিত্র
১) নীলরতন ( বয়স ৫৮) — একজন মানবতাবাদী কৃষক। নিঃসন্তান। বহু বছর আগে নদীর ধারে একটি অজানা শিশুকে কুড়িয়ে পেয়ে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন।
২) সোনালী (৫২) — নীলরতনের স্ত্রী। স্নেহময়ী মা।
৩) আব্দুল ( বয়স ২৫) — অজানা পরিচয়ের যুবক। নদীর ধারে কুড়িয়ে পাওয়া। নীলরতন ও সোনালীর কাছে মানুষ হয়েছে।
৪) মাওলানা কাদের (৬০) — শিক্ষিত ও মানবিক ধর্মীয় নেতা।
গ্রামবাসী
৫) রহিম
৬) করিম
৭) জব্বার
৮) সালাম
গ্রামের আরও ২–৩ জন মানুষ।
দৃশ্য–(১)
(মঞ্চে বিশাল বটগাছ। পাখির ডাক। দূরে আজানের ধ্বনি। গাছের গুঁড়িতে বসে আছে আব্দুল। তার চোখে গভীর বিষাদ।)
(ডান দিক থেকে সোনালী প্রবেশ করে। হাতে একটি গামছা।)
সোনালী: (হেসে) কী রে... এখানেই বসে আছিস?
আব্দুল: (চুপ)
সোনালী: আজ জুমার দিন। নামাজে যাবি না?
(আব্দুল ধীরে মাথা তোলে।)
আব্দুল: মা...
আমার মসজিদ তো অনেক আগেই ভেঙে গেছে!
সোনালী: (অবাক) কী বলছিস?
আব্দুল: যে মসজিদে আল্লাহ থাকেন... যে মসজিদে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে... যেখানে ধনী-গরিব এক কাতারে দাঁড়ায়...
সেই মসজিদের মৃত্যু হয়েছে।
সোনালী: এসব কথা কেন বলছিস?
আব্দুল: কারণ এখন মসজিদের দেয়াল আছে... কিন্তু মানুষের বুকের ভেতর আর মসজিদ নেই নামাজ।
(সোনালী তার মাথায় হাত রাখে।)
সোনালী: তোর চোখে জল কেন?
আব্দুল: (কাঁদতে কাঁদতে) মা... আজ আমাকে আবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে— "তুই কার ছেলে?"
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
(আলো একটু কমে যায়।)
দৃশ্য–২
(নীলরতন প্রবেশ করেন। হাতে লাঠি।)
নীলরতন: কী হয়েছে?
সোনালী: আজ আবার ওকে কষ্ট দিয়েছে গ্রামের লোক।
নীলরতন: কে দিয়েছে?
আব্দুল: বাবা...
আমি কি তোমার ছেলে?
নীলরতন: (হেসে)
এ প্রশ্ন করছিস কেন?
আব্দুল: কারণ আমার রক্ত তোমার নয়।
নীলরতন: রক্ত মানুষকে আপন করে না বাবা... ভালোবাসা মানুষকে আপন করে।
আব্দুল: যদি একদিন আমার আসল বাবা-মা ফিরে আসে?
নীলরতন: তারা তোকে জন্ম দিয়েছে।
আমরা তোকে জীবন দিয়েছি।
(আব্দুল নীলরতনের পায়ে মাথা রাখে।)
দৃশ্য–৩ (ফ্ল্যাশব্যাক)
(আলো নীল হয়ে যায়। বজ্রপাতের শব্দ। বৃষ্টির শব্দ।)
(২৫ বছর আগের দৃশ্য শিশুর প্রচণ্ড কান্না।)
সোনালী: চিৎকার করে)
ওগো... এই কান্নার শব্দটা কোথা থেকে আসছে?
নীলরতন: নদীর দিক থেকে।
(দুজন দৌড়ে যায়।)
(মঞ্চের এক পাশে কাপড়ে মোড়ানো একটি শিশু।)
সোনালী: (কাঁদতে কাঁদতে)
হায় ভগবান!
এতটুকু শিশুকে কে ফেলে গেল?
নীলরতন: জানি না।
(শিশুকে কোলে তুলে নেয়।)
সোনালী: চলো থানায় খবর দিই।
(কিছুক্ষণ নীরবতা।)
নীলরতন:-যদি কেউ না আসে?
সোনালী--তাহলে?
নীলরতন - তাহলে আজ থেকে...
এ আমাদের সন্তান।
(সোনালী শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে।)
সোনালী:
আমাদের ছেলে...
(দর্শকের দিকে তাকিয়ে)
ভগবান...
আজ তুমি আমাদের সন্তান দিলে।
(শিশুর গলায় ছোট্ট একটি তাবিজ দেখতে পান নীলরতন।)
নীলরতন:
দেখো...তাবিজ আছে।
হয়তো মুসলিম পরিবারের সন্তান।
সোনালী:-তাতে কী?ধর্ম বদলাব না।ওর ধর্ম ওর কাছেই থাকবে।
আমরা শুধু মানুষ করে তুলব।
(দুজন শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। আলো ধীরে বর্তমান সময়ে ফিরে আসে।)
দৃশ্য–৪
(গ্রামের রাস্তা। কয়েকজন টুপি পরা লোক দাঁড়িয়ে।)
রহিম: এই যে তোমার নাম নাকি আব্দুল!
আব্দুল: হ্যাঁ।
রহিম: শুনলাম হিন্দুর বাড়িতে থাকিস?
আব্দুল: হ্যাঁ।
করিম: লজ্জা করে না?
আব্দুল: কেন?
জব্বার: তুই মুসলমান।
আব্দুল: হ্যাঁ।
জব্বার: তাহলে হিন্দুর বাড়িতে কেন?
আব্দুল: কারণ সেই বাড়িতে আমি মানুষ হয়েছি।
সালাম: তোর আসল বাপ-মা কে?
(আব্দুল চুপ।)
রহিম: বল!
আব্দুল: (শান্ত গলায়)
জানি না।
আমি শুধু জানি...
আমার বাবা নীলরতন আমার মা সোনালী।
(সবাই একে অপরের দিকে তাকায়।)
করিম: না...
ওরা তোর আসল বাবা-মা নয়।
আব্দুল: হতে পারে।
কিন্তু মানুষ হিসেবে তারা-ই আমার পৃথিবী।
(সবাই ফিসফিস করতে থাকে। এমন সময় দূর থেকে মাওলানা কাদের সাহেব প্রবেশ করেন। সবাই সালাম করে দাঁড়ায়। )
মাওলানা: এখানে এত ভিড় কেন?
করিম - এই আব্দুল হিন্দু বাড়িতে থাকে,
মাওলানা- তাতে কি আছে,, যে মানুষ ক্ষুধার্তকে খাওয়াই, অসহায় কি আশ্রয় দেয়, কিন্তু আল্লাহর বান্দা । কোথায় থাকে কোথায় খায় সেটা বড় কথা নয় ভালো কাজ করার নামই মানুষ, তোমরা শোনো মন্দির মসজিদ গির্জা গুরুদ্বার সবই মানুষের জন্য , মানুষকে যদি মানুষ না বাঁচায় , মানুষ যদি বা না থাকে , তবে ইট পাথরের ঘর দিয়ে কি হবে,, তোমাদের এই আচরণ দৃষ্টিভঙ্গ চেঞ্জ করো ,,
( আব্দুল এর ফোন আছে অন্যদিকে মৃদু সুরে আজানের শব্দ )
আব্দুল - ( কান্না করতে থাকে, আমি আসছি মা)
মাওলানা - কি হয়েছে ভাই?
আব্দুল- মসজিদের মৃত্যু !
মাওলানা- মানে?
আব্দুল- যে নীলরতন বাবা আমাকে ছোট থেকে মানুষ করলো ধর্ম শেখালো, মানুষ হতে শিখানো মসজিদ চিনালো একজন হিন্দু বাবা, বাবা-মার সেবা না করলে মসজিদ মন্দিরে যেয়ে লাভ কি হয় ! আজ আমার মসজিদের মৃত্যু !!
( সকলেই আব্দুরের দিকে তাকিয়ে থাকে আলো ধীরে নিভে যায়) দূর থেকে ভেসে আসে কান্না!!
সমাপ্ত
-----------
লেখক পরিচিতি:
মোঃ দাউদ হোসেন একজন কবি, লেখক, নাট্যকার, চিত্র পরিচালক, অভিনেতা, সম্পাদক ও সাংবাদিক। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯১ সালের ৪ই মে ধুলিয়ানের দেবিদাসপুরে এক দরিদ্র পরিবারে। পিতা- মোঃ আরশাদ আলি, মাতা-লালন বিবি। তিনি বাংলায় স্নাতক। ২০০৩ সালে তিনি ধুলিয়ান এ.বি. নাট্যদল নামে একটি নাটক দল তৈরি করেন। তাঁর লেখা অসংখ্য নাটক বিভিন্ন জায়গায় মঞ্চস্থ হয়েছে। নাটকের পাশাপাশি বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করেছেন যেমন- জঙ্গী, দুশমনি, কাবলার বিয়ে, শূন্য থেকে শুরু, পাঁচ কয়েদী ইত্যাদি এবং তিনি সিনেমা পরিচালনা করেছেন বেশ কয়েকটি সিনেমা যেমন- দাগ, দ্যা গ্রেট ভিলেন, আমি টোটো ওয়ালা, এবার খেলা হবে, তুই কে আমার, লোন ইত্যাদি। তাঁর লেখা সিনেমা ও চিত্রনাট্য বেশ কয়েকটি রয়েছে। এছাড়া তিনি 'সৌহার্দ্য সাহিত্য পত্রিকা' ও 'ডি নিউজ কলকাতা'র সম্পাদক এবং 'স্বপ্নের ভেলা সাহিত্য পত্রিকা'র সহ-সম্পাদক।
