ড. সাবিনা ইয়াসমিন - এর একগুচ্ছ কবিতা

 











দায়িত্ববোধ
ড. সাবিনা ইয়াসমিন

বাংলাদেশ

দায়িত্ব মানুষের অন্তরে জাগায় নীরব বিবেকের ডাক,
অহংকার ভেঙে সে দেখায় জীবনের কঠিন সত্যপথ।

মায়ার মোহ ভেঙে দিয়ে খুলে দেয় কর্মের প্রকৃত দিক,
যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ শেখে নিজেরই দায়ের ভার।

ইচ্ছা আর কর্তব্যের মাঝে চলে অবিরাম দ্বন্দ্বের খেলা,
একটি টানে ভোগের দিকে, অন্যটি টানে ত্যাগের ঘরে।

এই সংগ্রামে গড়ে ওঠে চরিত্রের অটল শিলা,
নতুবা মানুষ হারায় নিজেকে সময়ের অন্ধকারে।

অলসতা ধীরে ধীরে ঢোকে মধুর বিষের মতো শিরায়,
স্বপ্নকে সে ঢেকে দেয় ভ্রান্ত সুখের কোমল ছায়ায়।

কর্মহীন জীবন শেষে ফাঁকা করে দেয় আত্মার গভীরে,
সময়ের হিসাব তখন পড়ে যায় হারানোর দানায়।

যে দায়িত্ব বোঝে সে-ই জ্বালে অন্তরের সত্য আলো,
তার হাতেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের সুন্দর পৃথিবী।



কলমের খনন
ড. সাবিনা ইয়াসমিন


খোলা আকাশের নিচে বসে আছি আমি, হাতে কাগজ ও কলম— নিচে মাঠে এক রাখাল হাঁটে ধীরে, তার বাঁশির সুরে নীল নীরবতা ভেসে যায়।

দূরে এক কৃষক মাটির স্তর ভাঙে, ঘামের সাথে মিশে যায় সূর্য, জন্ম দেয় জীবনের অন্ন,তার কোদালের প্রতিটি আঘাতে মাটি যেন নিজের নাম ফিরে পায়।
আমি মাটির ভেতর নামি না— আমার শরীর সেই শ্রমের ভাষা জানে না, তবু আমি শব্দ খুঁড়ি, যেখানে মাটির বদলে জমে থাকে অপ্রকাশিত অর্থের স্তর।

রাখালের বাঁশিতে যেমন মাঠ জেগে ওঠে, তেমনি আমার বাক্য জাগাতে চায় সময়কে, কৃষকের কোদাল যেমন উন্মোচন করে মাটির সত্য, আমার কলম তেমনি খুলে দেয় চিন্তার গভীর স্তর।

পৃথিবী খনন হয় দুইভাবে— একটি মাটি দিয়ে, অন্যটি অর্থ দিয়ে,একটি জীবন দেয়, আরেকটি জাগায় চেতনা।

আর আমি নেমেছি দ্বিতীয় খননে— যেখানে শব্দ বুনে যায় মানুষের ভেতর, আর মৌনতা শেখায় সত্যের উচ্চারণ।

কারণ কলমের খননে রক্ত ঝরে না— জন্ম নেয় নতুন উপলব্ধি।


জলের শহর ভেনিস: প্রেমের প্রবাহ
ড. সাবিনা ইয়াসমিন


সময়ের ক্লান্ত বুকে ভেসে থাকা এক নগর, যেখানে ঘড়ির কাঁটা জলের দিকে নিঃশব্দে ঝুঁকে পড়ে, যেখানে স্থল ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় প্রবাহের গভীরে, আর জল হয়ে ওঠে পথ, ভাষা ও জীবনের একমাত্র ঠিকানা—এই শহর ভেনিস, ইতালির বুকে লেখা এক জীবন্ত কবিতা।

এখানে রাস্তা নেই, আছে নীল খালের সর্পিল রেখা, যেখানে ঢেউ নিজেই পথ দেখায় আবার নিজেই পথ হারায়; প্রতিটি জলধারা যেন স্মৃতির দীর্ঘ নিঃশ্বাস, যা শহরটিকে বাঁচিয়ে রাখে এক অনন্ত নীরবতায়।

গন্ডোলা নামে কালো এক সুর ভেসে চলে জলের বুকে, মাঝির বৈঠায় জেগে ওঠে প্রেম ও বিষাদের মিশ্র সংগীত, ঢেউ তখন আর কেবল জল থাকে না, হয়ে ওঠে হৃদয়ের স্পন্দন, অদৃশ্য এক কাব্যভাষা।

পাথরের ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে সময়ের কাঁধে, তাদের গায়ে লেগে আছে শতাব্দীর আলো, ধুলো আর ইতিহাস; জানালার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে হারানো দিনের চুপিচুপি কথা, যেন দেয়ালগুলো এখনো কাউকে নীরবে ভালোবাসে।

সেতুগুলো এখানে শুধু সংযোগ নয়, দুটি দূরত্বের মাঝে ঝুলে থাকা এক চিরন্তন প্রশ্ন; এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে যাওয়া মানে নিজের ভেতরের হারিয়ে যাওয়া অংশকে আবার ছুঁয়ে ফেরা।

ভোর নামে এক সোনালি স্পর্শ ধীরে নেমে আসে, জলের মুখে লিখে দেয় আলোর প্রথম চুম্বন,আর সন্ধ্যা এলে আকাশ ভেঙে পড়ে রক্তিম কবিতায়, যেখানে আলো আর ছায়া একে অপরকে জড়িয়ে ধরে প্রেমিকের মতো।

রাত নামলে শহর বদলে যায় নক্ষত্র-ভাসা আয়নায়, জল তখন আকাশের উল্টো প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে, নিস্তব্ধতার গভীরে জন্ম নেয় এক অশ্রুত সুর, যা শোনে শুধু হৃদয়—ভাষা নয়, আত্মার শ্রবণ।

এই শহর উচ্চস্বরে কিছুই বলে না, তবু প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি সেতু, প্রতিটি আলো মৃদুস্বরে বলে এক চিরন্তন সত্য—প্রেম মানে থেমে থাকা নয়, প্রেম মানে অনন্তভাবে প্রবাহিত।



আমি এখনও মানুষ হতে চাই
ড. সাবিনা ইয়াসমিন


আমি খুব বড় কিছু হতে চাইনি,
শুধু মানুষ হতে চেয়েছিলাম-
কিন্তু এই পৃথিবী
মানুষ হতে দেয় না সহজে।

চারদিকে হিসাব, লোভ, মিথ্যে মুখ-
আমি মাঝে মাঝে নিজের কাছেই লজ্জা পাই।

তবু আমি হার মানিনি,
রাতের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেছি একা,
দেখেছি-
একটা ছোট্ট সত্যও
কীভাবে বুকের ওপর পাহাড় হয়ে বসে।

আমি প্রেমে পড়েছি-
দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি,
একটা ক্ষুধার্ত শিশুর চোখের ভিতর
যে আগুন জ্বলে, তার প্রতি।

আমাকে বলা হয়-
চুপ থাকো,
সবাই যেমন থাকে তেমন থাকো-
আমি পারিনি।

কারণ আমি দেখেছি,
চুপ থাকা মানে ধীরে ধীরে
নিজেকে মেরে ফেলা।

তাই আমি কথা বলি,
ভুল করেও থামি না-
বলেই যাই।

কারণ আমার ভেতরে এখনও
একটা মানুষ বেঁচে আছে।
আর যতদিন সে বেঁচে থাকবে,
আমি লিখে যাবো-

এই পৃথিবীর বিরুদ্ধে নয়,
এই পৃথিবীর পক্ষেই।



অণুর ভিতর অনন্ত আলো
ড.সাবিনা ইয়াসমিন


শান্তির প্রান্তরে যখন আত্মা জাগে,
সহস্র সূর্যের মতো অন্তর আকাশ দীপ্ত হয়ে জ্বলে;

একটি ক্ষুদ্র প্রাণের চোখে যে মহাবিশ্ব হাসে—
মহান দর্শন শেখায় হৃদয় কীভাবে ভালোবাসে।

পাথরের বুকে যেমন লুকিয়ে থাকে আগুন,
তেমনি মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির অগণন গুণ।

লোভের মরুভূমি পেরিয়ে যে মন হয় নির্মল,
তার পদধূলিতে ফোটে শান্তির স্বর্ণকমল।

জীবন শুধু জয়ের নাম নয়, নয় অন্যের পরাজয়,
নিজেকে জয় করাই মহাকালের সত্য পরিচয়।

অহিংসার মন্ত্র যেন নক্ষত্রের ভাষা,
যেখানে করুণা জ্বালায় অনন্তের আশা।

একটি পিঁপড়ের পথেও আছে সৃষ্টির গান,
একটি পাতার স্পন্দনে লুকায় জীবনের আহ্বান;

যে হৃদয় আঘাত দেয় না কোনো জীবের প্রাণে,
সে-ই তো আলো খোঁজে নিজের অন্ধকারের গহীনে।

অন্যকে জয় করে মেলে ক্ষণস্থায়ী সম্মান,
নিজেকে জয় করলেই জাগে অনন্তের জ্ঞান।

“এক ফোঁটা করুণার ভিতর লুকিয়ে থাকে মহাসমুদ্র,
একটি নির্মল আত্মাই পারে বদলে দিতে বিশ্বভুবন।”

নীরব সাধনার পথে যে এগিয়ে চলে ধীরে,
তার চেতনা ফুল হয়ে ফুটে অমৃতের নীড়ে।

অপরিগ্রহ শেখায়—ধরা নয়, মুক্তিই ধন,
ত্যাগের আকাশে উড়ে পবিত্র মানবমন।

হে অন্তরের যাত্রী, খোঁজো না দূরের স্বর্গ,
তোমার আত্মার মাঝেই জ্বলে অনন্ত দীপের অর্ঘ্য।

“মিথ্যার কুয়াশা ভেদ করে সত্যের প্রভা আসে।”
জৈন দর্শনের আলো যুগের হৃদয়ে ভাসে।

যেখানে নেই হিংসার ছায়া, নেই অহংকারের দেয়াল,
সেখানে মানুষ হয়ে ওঠে আলোর এক নির্মল সকাল।


©®Dr. Sabina Yeasmin.
All Rights Reserved.
No part of this work may be used without permission.

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url