শিকড়ের আলো (গদ্য কবিতা), রচনায়: প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল

 


প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল এর ফটো










শিকড়ের আলো (গদ্য কবিতা)
রচনায়: প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল
কবি, লেখক, শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

যুবক, আকাশ ছুঁতে চাও বাধা নেই, ছোঁও; তবে মনে রেখো, আকাশে উড়তে যেমন ডানা লাগে তেমনি টিকে থাকতে প্রয়োজন শিকড়ের শক্তি আর মাটির অক্সিজেন।
ইতিহাস কোনো ধূলিধূসর পাণ্ডুলিপি নয়, সে তোমার রক্তে লেখা প্রথম পরিচয়পত্র, সময়ের আয়নায় আত্মার প্রতিবিম্ব।

ঐতিহ্য কোনো জাদুঘরের নিস্তব্ধ প্রদর্শনী নয়; সে নদীর উৎস, যার জল শুকিয়ে গেলে সভ্যতার সাগরও লবণাক্ত হয়ে ওঠে।
সংস্কৃতি হলো প্রদীপের শিখা, তেল ফুরিয়ে গেলে আলো নয়, মানুষের অন্তরই অন্ধকারে ডুবে যায়।

মাতৃভাষা সেই অদৃশ্য নাভিনাল, যার টানে মানুষ জন্মভূমির হৃদস্পন্দন শুনতে শেখে।
যে প্রজন্ম শিকড় ভুলে যায়, সে ঝড়কে স্বাধীনতা মনে করে; অথচ প্রথম ঝাপটাতেই দিকহারা নাবিকের মতো কূলহীন পারাবারে হারিয়ে যায়।

মনে রেখো, প্রযুক্তি তোমার গতি দিতে পারে, কিন্তু গন্তব্য দেখায় ইতিহাস; সম্পদ তোমার ঘর গড়ে, কিন্তু সংস্কৃতি তাকে আপন ঠিকানায় রূপ দেয়।
মানুষের প্রকৃত উচ্চতা ভবনের তলায় নয়, মূল্যবোধের গভীরতার দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ হয়।

যে হৃদয়ে ভাষা আন্দোলনের রক্তিম স্মৃতি জাগে, মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ দীপশিখা হয়ে জ্বলে, সে হৃদয় অন্যায়ের কাছে কখনো নত হয় না।

উৎসবের আসল রং পোশাকে নয়, মানুষের প্রতি মানুষের মমতাময় পূর্ণিমার দীপ্ত আলোকচ্ছটায়।
অতিথির জন্য খোলা দরজা, প্রতিবেশীর দুঃখে বাড়িয়ে দেওয়া হাত, ভাগ করে নেওয়া অন্ন-জল, এসবই জাতির নীরব মহাকাব্য।

ভোগের বাজার তোমাকে ক্রেতা বানাতে চায়, পক্ষান্তরে শিকড়ের ইতিহাস তোমাকে মানুষ হতে শেখায়।
নিজেকে এত আধুনিক কোরো না, যাতে নিজের মাটির গন্ধই অপরিচিত হয়ে যায়; আবার এত অতীতে থেকো না, যাতে ভবিষ্যতের সূর্যোদয়ও দেখতে না পাও।

নদী যেমন উৎসকে অস্বীকার করে সাগরে পৌঁছাতে পারে না, তেমনি শিকড়হীন স্বপ্নও একদিন মরীচিকায় বিলীন হয়।
তাই জ্ঞানের সঙ্গে প্রজ্ঞা, অগ্রগতির সঙ্গে মানবতা, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব এবং প্রযুক্তির সঙ্গে সংস্কৃতির সেতুবন্ধন গড়ে তোলো।
তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ হোক এমন, যাতে আগামী প্রজন্ম তোমার পদচিহ্নে তাদের ভবিষ্যতের মানচিত্রে আঁকা পথ খুঁজে পায়।

মনে রেখো, ইতিহাসকে ধারণ করা মানে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়; বরং অতীতের আলো হাতে নিয়ে ভবিষ্যতের পথ আলোকিত করা।
যে জাতি তার শিকড়কে ভালোবাসে, সে-ই বিশ্বমানবতার বৃক্ষে সর্বাধিক সবুজ পাতা হয়ে দোলে।

অতএব, মাটির অতীতের সোঁদা গন্ধ ভুলে নয়, বরং অতীত সংস্কৃতির কাদা জল মিশ্রিত মাটিকে গায়ে মেখে নিয়েই আকাশ জয় করো;
ভাষাকে হৃদয়ে, সংস্কৃতিকে আচরণে, মানবতাকে চরিত্রে এবং ইতিহাসকে চেতনায় ধারণ করো।
তবেই তোমার ব্যক্তিজীবন হবে আলোকিত, সমাজ হবে মানবিক, আর জাতি দাঁড়াবে আত্মমর্যাদার অটল শিখরে।
অর্থাৎ শিকড় যতই দৃঢ় হয়,
শিখর ততই প্রদীপ্ত হয়।

কপিরাইট আইনের সর্বস্বত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত।
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা, বাংলাদেশ।



কবি প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল -এর পরিচিতি:

“আমি শব্দে খুঁজি আলো, জ্ঞানে গড়ি সেতু, মানুষের হৃদয়ই আমার ঠিকানা।” 
---- প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল

প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল, শব্দ ও বিজ্ঞানের ধারক ও বাহক এবং আলোকযাত্রী।
"মানুষকে ভালোবাসো, জ্ঞানকে ছড়াও, আর সৃজনশীলতায় গড়ো অমরত্ব।"
এটা এক জীবনদর্শন, যা প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলালের পথচলার প্রতিটি বাঁকে জ্বলজ্বল করে।
১৯৫৭ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণের পর দিনাজপুরের সবুজ প্রান্তর থেকে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা পৌঁছেছে ঢাকার ব্যস্ত নগরীতে। এই মননশীলতা সৃজনকারী মূলত জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে একত্রে বুনেছেন মানবতার ছায়াতলে।
তাঁর কর্মজীবন যেন এক দীপ্তিময় প্রদীপ, যার শিখা জ্বলে অধ্যাপনা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার ত্রিবেণীতে।

তিনি প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং প্রাণিবিদ্যায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
তিনি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি তিতুমীর কলেজ ঢাকা, বিএম কলেজ বরিশাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ঢাকা, সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মানিকগঞ্জ সহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা ও গবেষণায় তিন দশকেরও বেশি সময় নিবেদিত করেছেন।

কীটতত্ত্বে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা আজও দেশের গর্ব, আর বাংলা ভাষায় ১৪টি মাস্টার্স, অনার্স, এইচএসসি ও এসএসসি পর্যায়ের বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তক রচনা করে তিনি জ্ঞানের দরজা খুলেছেন মাতৃভাষার সুরে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা জার্নালসহ সাময়িকী, ম্যাগাজিন ও পত্রিকায় তার দশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ধানের মাজরা পোকা ও পাটের শুঁয়োপোকার সেক্স ফেরোমন সম্পর্কে এমএসসি থিসিস পেপার ও কালা জ্বরের বাহক সেন্ডফ্লাইর বায়োনোমিক্স ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে পিএইচডি থিসিস পেপার প্রকাশিত হয়।

তিনি কেবল বিজ্ঞানী নন, তিনি একজন কাব্যিক স্বপ্নশিল্পী।
তাঁর কলমে ফুটে ওঠে জীবনবোধ, মানবতা, প্রেম ও প্রকৃতির অনন্ত রূপ।

কবিতা, গান, রুবাইয়াত, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সব শাখায় তাঁর কলমে জেগেছে।
ত্রিশের অধিক গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। তাঁর “জ্যোতির্ময় একুশ”, “মননশীল সৃজন”, “মোস্তফা গীতি”, "দারিদ্র্যের কশাঘাত", "মানবতার জাগরণ", "চেতনার আলো" এবং ইংরেজি ভাবানুবাদ সহ তিন খণ্ডের “রুবাইয়াত-ই-প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল” প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি আলোকস্তম্ভ।

বিটিভি ও বেতারের শিল্পীগণ কর্তৃক সুরারোপিত তাঁর গীতিকবিতা ও প্রাণিবিদ্যায় বাংলাদেশে কলেজ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ২০১৩, কলেজ পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ২০০৪, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনুবাদ সহ সাহিত্যে দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা এবং ৫৪৪ পৃষ্ঠার "দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস গ্রন্থে" কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে তার জীবন বৃত্তান্ত সংযোজন সাক্ষ্য দেয় যে তিনি সময়ের সাক্ষী ও সমাজের পথপ্রদর্শক।

দেশি ও বিদেশী পত্রিকা, সাময়িকী, ম্যাগাজিন ও যৌথ গ্রন্থে ৫০ টির অধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।

তিনি বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সোসাইটি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন, বাংলাদেশ অবসর কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, ′জাতীয় কবি সংগঠন অনুপ্রাস, বাংলা কবিতার আসর, অধ্যয়ন সাহিত্য সংস্কৃতি গ্রুপ, সাহিত্য সংস্কৃতিক চত্বর সহ বহু সংগঠনের সাথে যুক্ত রয়েছেন।

প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলালের জীবন এক দীর্ঘ কবিতা, যেখানে কর্ম, ত্যাগ ও স্বপ্নের মিশ্রণে মানবতার শিখা চিরকাল দীপ্তিমান।




Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url