বাউলের দেশ-২, কবি - নাসির ওয়াদেন
বাউলের দেশ-২
নাসির ওয়াদেন
১.
এখানে কোন ফুল নেই, শৌর্য্য নেই
বিশ্বাস কখন এখানে এসেছিল
আমার পূর্বপুরুষরাই কেবল জানত
দু'দিনের অতিথি তবে এত কথা কেন?
এসেছ বেড়াতে, চলে তো যাবেই
শুধুই দেখে যাওয়া, চোখ দুটো বন্ধ রাখা
ফুল যদি কখনও ফোটাতে পারো
দেখবে মায়ার-ছায়া গাছ হয়ে জন্মে
ফুলের সৌরভ তখনই সুগন্ধি ছড়ায়
এ বাউলের দেশ, এখানে বাতাসও করে প্রেম
মাটির সাথে পরম সৌহার্দ্যের, ভালবাসার
যাবার আগে দেখো কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।
২.
এ মাটি আমার পিতৃতান্ত্রিক পিতামহের দেশ
খেয়ে পড়েই বেঁচে থাকা অসীম কৃপায়
মাটি কেটে ধুলো ঝেড়ে এ মেঠো-ভূমে
কত শ্রম রক্ত হয়ে লেগে আছে এ-বুকে
আমাদের ছিল আমার আছে,তবু যেতে হয়
দর্পে,অহংকারে শত দারিদ্র্য আমার চিরসাথী
ভাঙা সকালে সাড়ে সাতটায় দিবসে নিশিতে
পদ্মাবতী, রামী, ফুল্লরা, সীতা বেহুলা রমনী
লাউসেন এসেছিল,কালকেতু,এযুগের চণ্ডীদাস
কতদিন পাড়ে বসে করে ইঙ্গিত, মাঠে মাঠে ঘাস
এ যন্ত্রনার শেষ নাই, ধুলোর ভেতর সৌহার্দ্য গাঁথি।
৩.
সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ঠিক করা হলে
আলোচনার আর কী প্রয়োজন থাকে?
ভুল করে পথ চলতেই সঠিক পথের নিশানা
আমার সামনে ফিরে আসে,সবকিছুতেই বিস্বাদ
ঈশ্বরের বন্ধ দরোজা খুলে দেবার দায়িত্ব যার
সে তো ঘুমিয়ে পড়েছে সুগভীর যন্ত্রণাতে
মুক্তির জল সহজ পাচ্য, সুমধুর, সুঘ্রাণ
ভালবাসার দোকানে কিনে নেবে, মুক্তির স্বাদ
ভালবেসে বলা,সাহস নিয়ে কিছু করা, দম লাগে
মুখে নয়,কর্মের ভেতরে ভালবাসা ফোটে গুলবাগে।
৪.
আলখাল্লা পরে কে চলে যায়, ধুলোপথে
এ মাটি পবিত্র হয় তোমাদের কণ্ঠস্বরে
চাষাভুষার দেশ, জন্ম দুঃখিনী,দৈন্যদশা
মাঠে মাঠে আকাল, বেহুলার ঘরে শুধু লাশ
লক্ষ হাজার বছর হোমো সাপিয়েন্সেরদল
বনচারী, বনবাসী যারা বনে করে বসবাস
তাদের যতটা দুঃখ ছিল, বেশি ছিল আশ্বাস
কীভাবে সন্তানেরা,প্রজন্ম বেঁচে রবে চিরকাল
সে সকাল মধুর ছিল, ভালবাসা সোনা দিয়ে মোড়া
কলুষ,হিংসা,লোভ এসে ছড়িয়ে দিল বিভেদের চারা।
৫.
সব ঠিক হয়ে যাবে বলে প্রতিটি মিথ্যেকথা বলা
প্রতিশ্রুতি আর প্রলোভন দিয়ে যাবে না কিছু করা
সত্য-মিথ্যা পরস্পরের দিকে আঙুল তুলে কথা বলে
সত্যেরে কী ঢাকা যায় কখনো মিথ্যের সংলাপে
রামধনু সাতরঙ ছড়িয়ে আজও আকাশে ওঠে
কত রঙবাহারি লীলাখেলা দেখি বাইরে মুখোশ
সব ঠিক আছে, কিছুই ঠিক নেই ভ্রান্তির কোলে
বিভ্রান্তি ঘটে রেষারেষি থেকে দ্বন্দ্বে যাক কেটে
আকাশে উঠে ঝড়, টলমল হাল ঝাপসা দিগন্ত
কোন পথে হাঁটা? ছুটে চলা সবকিছু যে বিকল
এ যাত্রার আদি নেই , নেই চলমান অনন্ত স্রোত
শেষহাসি হাসে তারাই মুখ,আদল যতই বদলাক
-----
কবি পরিচিতি :
কবি নাসির ওয়াদেন, বীরভূম জেলার মুরারই থানার রঘুনাথপুর গ্রামে ১৯৫৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই লেখালেখির শুরু। গ্রামের পাঠশালা থেকে পাঠ শুরু করে রামপুরহাট কলেজ থেকে স্নাতক হন। ১৯৯৫ সালে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হন এবং অবসর গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষকতায় যুক্ত আছেন। কবির কবিতাগ্রন্থ হলো ,'অন্ধকার কুরুক্ষেত্র খোঁজে', 'কোকিল ডাকলেই বসন্ত আসে' ,' বিবর্ণ বৃষ্টি ভেজা দাগ', 'বুক ছুঁয়েছি নগ্ন রাতে', 'অদৃশ্য অস্তিত্বের দরোজা', 'বাউলের দেশ' 'তালপাতার পুঁথি ও অন্যান্য কবিতা ' ইত্যাদি। কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও 'অথবা অন্য পৃথিবী' নামে একটি গল্পগ্রন্থ আছে এবং কবিতা বিষয়ক গদ্য লিখিত একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ 'নির্বাচিত প্রবন্ধ' গ্রন্থ বিদ্যমান।
দেশ-বিদেশের বহু পত্রপত্রিকায় ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখেছেন ও লিখে চলেছেন। কবি বিভিন্ন সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন,যেমন" জিরো বাউন্ডারি কবিতা "?সম্মান", "সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ সম্মান ", " হৃদয়ের কথা সম্মান " ছাড়াও বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন।
