নাটক: বিবেক খুঁজছি... নাট্যকার - মোঃ দাউদ হোসেন

 


মোঃ দাউদ হোসেন - এর ফটো









বিবেক খুঁজছি...
মোঃ দাউদ হোসেন



চরিত্রলিপি

১) আকাশ (নেতা, বয়স ৬০)
2) অজয় (ঐ ছেলে বেকার, বয়স ৩০, ছদ্দবেশীপাগল )
৩) সুজয় (থানার বড়বাবু, বয়স ৪০)
৪) অনিল (নেতার চামচা, বয়স ৫০)
৫) চার জোন মৃত্যু লাস নিয়ে যাবে
৬) করিম (প্রতিবন্ধী অজয়ের বন্ধু)
৭) বিশাল (মাতাল কোটিপতির ছেলে, বয়স ৩০)
৮) জীবন (কবিতা প্রেমিক, বয়স ৬০)


(পর্দা খুলে পাগল বেশে অজয়)
অজয় - মানবতা যখন আক্রান্ত.. নীরবতা তখন অন্যায়!
ন্যায় ,অন্যায়, বিবেক আবেক! কে কাকে খুঁজছে .. কৈউ একমুঠো ভাত... কৈউ অর্থ... কেউ চাকরি... কেউ বিচার... বিচার হি হাঁ হাঁ হাঁ... অন্যায় অবিচারের মাঝে বিচার- বিবেক নিঃস্ব হচ্ছে... মানুষের চাওয়া পাওয়াই অন্ধকার নেমে আসছে... ঘন অন্ধকার! আমার বাবা থেকেও নেই, মা ছিল- ছিল, ছিল সুন্দর জীবন! বিবেকের বিচার চাইতে গিয়ে আমি পাগল, পাগল আমি (অজয়ের প্রচন্ড চিৎকার হাসি- দু'পায়ে অক্ষম করিম হাসে )
করিম - এই ভাই, এত রাতে এখানে চিৎকার করছিস কেন? ওহহ তুমি তো পাগল।
অজয় - হ্যা আমি পাগল... পাগল তো তোরাই বানিয়েছিস... ন্যায় অন্যায় ভুলে গিয়ে নিজের পেট দেখছিস, বিচার বিবেচনাকে জলাঞ্জলিত দিয়ে বিবেক হারিয়ে ফেলছিস, হারিয়ে ফেলছিস ফুলের মতো সুন্দর সমাজটাকে।
আজ আমার পাগলামি - যারা তিলে তিলে  সুস্থ সমাজটাকে অসুস্থ বানিয়েছে, যে মানুষগুলোর টাকার লোভে নিজের সন্তান স্ত্রীকে হত্যা করতে ছাড়ে না, আমার পাগলামি তাদের বিরুদ্ধে যারা দুচোখ মেলে অন্যায় করে বিবেককে প্রশ্ন করতে পারে না, পাগলামি তাদের জন্য।
করিম - গলটা চেনা চেনা লাগছে।
অজয় - পরিচিত হাঁ হাঁ আমি কারো চেনা মানুষ নই ! আমার বাবা  একজন নেতা, গিরগিটির মতো রং পরিবর্তন করে, যাদের কাছে ভোট নিত তাদেরকে পেটে ভাতে সব রকমভাবে হত্যা করত,, শাসন হাতে নিয়ে শোষণের সীমা যখন লংঘন করে দেয়। আমার মা ছিল সতী সাবিত্রী, ঐদিন মা-বাবাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলতে লাগল আমি তখন ছোট ছিলাম, হুংকার দিয়ে বাবাকে বলেছিল মা -তোমার বিবেক নেই... অসহায় গরীব মানুষগুলো তোমার পিছনে পিছনে জিন্দাবাদ- জিন্দাবাদ করে চলত... তাদের স্লোগানে তুমি কিন্তু নেতা হয়েছ আর তুমি তোমার বিবেককে বলি দিয়ে ওই সাধারণ মানুষগুলোকে শোষণ করছো ,, সরকারের বাড়ির নামে টাকা, নানান দুর্নীতিরযুক্ত হচ্ছে... মা বাবার বিবেকে প্রশ্ন ছুড়তেই বাবাও চিৎকার করে ওঠে আর পড়ে থাকা একটি লাঠি দিয়ে মায়ের মাথায় মারল... মা রক্তাক্ত !! রক্ত-রক্ত চারিদিকে রক্তে রক্তাক্ত হয়ে গেল আমার চোখের সামনে! মা চিৎকার করতে করতে মারা গেল... আমি মাকে চাপটে ধরে হাউ মাউ করে চিৎকার করে কান্না করতে থাকলাম... একটু পরে পুলিশ  এলো.. মিডিয়া এল... বাবাও  তখন কান্না করতে লাগল। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। একটু পরে পাড়া-প্রতিবেশী প্রচুর লোকজন চলে এল। বাবা পুলিশ আর মিডিয়াকে ঘরে নিয়ে গেল। আমি জানালা দিয়ে দেখলাম অনেকগুলো টাকার বান্ডিল দিল হাসিমুখে পুলিশ চলে গেল আমার মাকে নিয়ে ছবি করতে লাগল মিডিয়া... পরের দিন সকালে পেপারে বাবার বিরোধীরা মাকে খুন করেছে ... বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে। বাবার বিরোধী নেতাটা সমাজের উন্নয়ন করত, অসহায় মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিত... বাবার নিজের বিবেককে প্রশ্ন না করে সেই লোকটাকে পুলিশে টানতে টানতে নিয়ে গেল। আমার মাকে খুন করেছে... আসলে আমার বাবা খুনী।  বিবেককে প্রশ্ন করি, আজও সেই বিবেক আমি খুঁজি... আমি এখান থেকে যায়; বিবেক আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে; বিবেক বিবেক বিবেক
("বিবেক" চিৎকার করতে করতে চলে যায় অজয়)
করিম - আমি এতক্ষণে চিনতে পারলাম। পঞ্চম শ্রেণিতে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ওর  নাম অজয়। এ তো আকাশ নেতার ব্যাটা। হঠাৎ কী হল? পাগল কেন ? তার মাকে মেরে ফেলেছে আমি তো জানতাম না ।।
এই অজয়ের সঙ্গে আমার কথা বলা জরুরী আছে।। আমিও  বাবা-মার কাছে প্রতিবন্ধী বলে লাঞ্ছিত পদদলিত,, আমারও তো প্রশ্ন যদি আমার বাবা-মার বিবেক না থাকে, আমি অজয়কে খুঁজি
(করিম চলে যায়.. লাইট অফ)



(আকাশ ও তার সহকারি কর্মী অনিলের-এর প্রবেশ)
আকাশ - সব খেয়ে নেব ! গরিব মানুষের রক্ত চুষে খেয়ে নেব! কেউ আমার কিছু করতে পারবে না! কেমন দিয়েছি বল? দু'বছর হলো আমার স্ত্রীকে নিজের হাতে খুন করে  হাহাহা বিরোধীপক্ষকে ভাসিয়ে দিলাম। হাতে আমার মিডিয়া, হাতে আমার আইন, কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। এলাকাই সব কিছুর নবাব আমি হি হি হি হা হা হা।
অনিল - সত্যিই আপনি এলাকার নবাব বাদশা হে হে হে। কথায় আছে সিগারেট ধরার পর টানলেও জ্বলে না  টানলেও জ্বলে, বিড়ি ধরার পর না টানলে জ্বলে না।
আকাশ - আরে চুপ। কী বিড়ি সিগারেট বলছিস হ্যাঁ!
অনিল - আপনি নেতা মানুষ বুঝতে পারছেন না, চার বছর পর বিড়ির মজুরি বাড়লো সামান্য ক'টাকা, আপনি বিড়ি বাজাচ্ছেন, আপনি নেতা, আপনি কন্ট্যাক্টর, আপনার সব টাকা। তাই বললাম ,, তবে একটা কথা বলব?
আকাশ - বল।
অলিন - একটা কচি মেয়ে বিয়ে করে ফেলুন...
আকাশ - বিয়ের কথা আর মুখ উচ্চারণ করবি না, বিয়ে শব্দটা আমার কাছে মানায় না,, আমি প্রতিরাতে একটি করে বিয়ে করি হিহিহি হাহাহা। তাছাড়া কোন মেয়ের বিয়ের পিরিতে বসে আমার এই ধন-সম্পদ তাকে দিতে চায় না... তাইতো দু'বছর আগে আমি আমার অজয়ের মাকে মানে আমার স্ত্রীকে খুন করেছি ।।
অনিল - বেশ করেছেন আবার খুন করবেন।
(অজয় আসে)
অজয় - খুন! সব মনে আছে বাবা। পৃথিবীতে ক'টা দিন আর বাঁচবেন, একদিন কারো হাতে তোমাকেও খুন হতে হবে, সেদিন সমাজের কাছে বিবেক চাইলে বিবেকের প্রশ্ন উঠবে না! বিবেক আকাশে ভাসে,, বিবেকে রাস্তায় পড়ে কাঁদে! বিবেকের চিৎকার চারিদিকে! হি হি হি হা আজও আমি বিবেক খুজি, আমি বিবেক খুঁজি...

(অজয় বিবেক খুঁজি বলে চলে যায়)
অনিল - আমি ছোট বাবুকে অনেকদিন পর দেখলাম তবে পাগল হয়ে গেছে তো।
আকাশ - শুধু আমার ছেলে পাগল নয় ! আমি পাগল করে দিয়েছি যুবসমাজকে হাঁ হাঁ হি হা হা।
গ্রামে গ্রামে বেকারত্বের জ্বালায় যুবসমাজ আজ পাগল। আমার ছেলে আমাকে বুঝিয়ে গেল বিবেক খুঁজতে ! বিবেক বিবেক
(আকাশ বিবেক করতে করতে অট্টহাসি হাসতেই থাকে চলে যাওয়ার পরেও। আকাশ অনিল চলে যেতেই প্রবেশ করে করিম)

করিম - বিবেক বিবেক না, মানে অজয় অজয় ভাই কোথায় ! সত্যি আজ প্রতিটি মানুষের যদি বিবেক থাকত, শিক্ষিত যুবকরা পাগল হত না।  আজ কোন ছেলের বিবেক আছে তো বাবা-মার বিবেক নেই; বাবা-মার বিবেক আছে তো ছেলের নেই; সমাজের বিবেক হারিয়ে গেছে; একদিন হয়তো আমাকে পাগল হতে হবে, পাগল হতে হবে
(বলতে বলতে চলে যায় করিম)।



(মদের বোতল হাতে বিশাল ঢোকে )
বিশাল - এই মদ খেয়ে খেয়ে আমি আমার বাবার ধন-সম্পদ সব শেষ করে দিলাম। আমার বন্ধু ইজাজ অনেকদিন আগেই বলেছিল, যাই করিস ভাই বিবেককে প্রশ্ন করিস।
আসলে এখন পর্যন্ত বিবেক কী জিনিস আমি বুঝতেই পারলাম না! বিবেক? আমাদের পাড়ার লোককে বললাম, বিবেক বলে কি কিছু আছে?
এখানে ওই কাকুরা বলল, বিবেক মারা গেছে।
পরে শালা বুঝতে পারলাম ওই পাড়ার একটা ন্যাংড়া ছোড়া বলছিল, বিবেক বলতে ভালো-মন্দ নেই, বিচার করার নামই বিবেক। এ বিবেক তো আমি কবে খেয়ে ফেলেছি মদের সাথে চ্যাট করে ।। আর আমার বিবেককে যদি নষ্ট করে থাকে ওই পাড়ায়, সে অজয়ের বাবা আকাশ। তার নেতৃত্বে মিছিল মিটিং করে করে আজ আমার শিক্ষা-বিবেক সব নষ্ট হয়ে গেছে। এই মদের বোতল কোনমতেই ছাড়তে পারছিনা।  এই মদ এই মদ কি আমার বিবেক নষ্ট করেছে... কার কাছে আমি জিজ্ঞেস করি। দেখি কোথায় পাই বিবেক?  খুঁজি।
(মাতাল চলে যায়)


(আকাশ চেয়ারে  চুপ  করে বসে আছে, পাশে আছে অনিল)
অনিল - নবাব সাহেব।
আকাশ - তোর নবাবের চুপ! আমার ছেলে আমাকে বিবেকের আঘাত করেছে, আমাকে বিবেক খুঁজতে বলছে হ্যাঁ। দু'বছর থেকে আমার ছত্রছায়ায় না এসে পাগলের মত তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে বিবেক আর আমাকে বলে কিনা বিবেক খুঁজতে ।। এই ছোঁড়াকে তো গুলি করে মারতে হবে, নইলে আমার হয়তো একদিন পথের কাঁটা হয়ে যাবে, শোন অনিল, অজয়কে পেলে গুলি করে দিবি।
অনিল - আপনার ছেলেকে গুলি করতে পারবেন?
আকাশ - পারবো আলবাত পারবো, এই পাষন্ডটা যখন নিজের স্ত্রীকে গুলি করতে পারে, সন্তানকে গুলি কেন করতে পারবে না? টুকরো টুকরো করে মাংসের পিস করে কুত্তাকে খাওয়াতে পারবে কারণ আমি আমি সেই আকাশ- যে আকাশে কোন মায়া নেই, যে আকাশে কোন মমতা নেই, যে আকাশে কোন বিবেক নেই, এ আকাশ শুধু চাই পৃথিবীর সমস্ত ধন-দৌলত। এ আকাশ নীল আকাশ নই, এই আকাশ বিবেকহীন আকাশ... এই কোটি কোটি টাকা কারো হাতে তুলে দিতে আসেনি আকাশ।
অনিল - ঠিক আছে নবাব, এখন ঘরে চলুন, খাবেন। ওরা চলে এসেছে।
আকাশ - কে কে এসেছে?
অনিল - ঝিলিকের মা। কী সুন্দর লাল শাড়ি পড়ে। যেন কচি করে নতুন বউ লাগছে।
আকাশ - তাই চল...
(চলে যায় আকাশ ও অনিল)


(গভীর রাতে চারজন মৃত্যু (মেয়ে ) লাশ নিয়ে যাচ্ছে, অজয় একদিকে বসে আছে)
অজয় - এই তোমরা কারা ! এই মেয়েটা কে ! কেউ এখান থেকে পালাবে না,, আর আমি সব কে মেরে দেব। বল, মেয়েটা কে হয় তোমাদের? আর কোথায় বা নিয়ে যাচ্ছ এই মেয়েটাকে নিয়ে -
একজন - আসলে এই মেয়েটা দূর থেকে এসেছে ,, আমাদের নেতা আকাশের গভীর রাতের সঙ্গিনী ছিল। সবাই মিলে মেয়েটাকে মেরে ফেলেছে। তাই নেতার হুকুম মেয়েটাকে নদীতে ফেলে দিতে যাতে কোনভাবে কেউ না জানতে পারে।
অজয় - আমি জানতে পেরেছি ,, অসহায় নারী টাকার বিনিময়ে গভীর রাতে আনন্দ দিতে এসেছিল, তাকেও জানোয়ারটা মেরে ফেলে দিল,, হাইরে বিবেক। এই দাঁড়াও তোমরা যাবে না, কেউ কোথাও যাবে না। পুলিশ পুলিশ (  পুলিশ বলে চিৎকার করে এক দরজা দিয়ে অন্য দরজায় আসে অজয় .. এসে দেখে কেউ নেই মৃত লাশটা পড়ে আছে ,, গভীর রাত শিয়ালের গর্জন)
অজয় - কেউ নেই ! শুধু লাশ ! মানুষ টাকার বিনিময়ে বিবেক বিক্রি করে মানুষ হত্যা করে। যে মানুষ হত্যা করে সে ধর্মহীন ! অমানুষ কুকুর।
কিন্তু আজ আমার মত আরো কত সন্তান মায়ের জন্য চিৎকার করে কান্না করছে,! আমার এই বাংলায় আমার মত আরো কত শিশু মায়ের জন্য কান্না করছে ! এখন তো আমার বাবা করেছে। এই অসহায় মা আজ রক্তাক্ত... রক্ত...লাশ ... মৃত্যু... বিচারহীন সমাজ বিবেকহীন মানুষ পশুত্ব নিয়ে পুরুষ জন্মেছে আজ... নারী কি পুরুষের লালসা? কয়েকটি কুলাঙ্গারের জন্য মায়ের জাত নারীরা আঙুল তুলে বলবে, কুলাঙ্গার পুরুষ।
    (পুলিশ সুজয় বাবু ফোন করতে করতে আসে )
পুলিশ -  হ্যাঁ সাহেব, হ্যাঁ। কেউ টের পাবে না। মেয়েটাকে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেব।  ঠিক আছে রাখছি (ফোন রেখে)
পুলিশ - এই পাগল সর, লাশটাকে পোস্টমর্টেমে পাঠাবো।
অজয় - হ্যাঁ হ্যাঁ এই মেয়েটাকে খুন করেছে, ধর্ষণ করেছে আমার বাবা নেতা আকাশ।
পুলিশ - তোর বাবা আকাশ নেতা।
অজয় - হ্যাঁ। ওই মানুষটাই খুন করেছে , যারা এই লাশটাকে ফেলতে এসেছিল তারাই বললো...
পুলিশ - বেশি কথা বলিস না, চুপচাপ থাক। নয়লে তোকে লকাপে দেব মেয়েটাকে তুই মেরেছিস বলে।
অজয় - আপনার বিবেক কত টাকায় বিক্রি হয়েছে স্যার। আপনি কি আপনার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন? আপনি কি আপনার সন্তানকে পাগল বানিয়েছেন?  আপনিও কি কত অসহায় মানুষকে বিচার না দিয়ে জেলে পড়েছেন? আপনার বিবেকের দাম কত টাকা স্যার? আমার কাছে ১০ টাকা আছে, এই দশটি টাকা নিয়ে আমার কাছে বিক্রি করে দিন আপনার বিবেক! যে বিবেকে একটি নারী ন্যায়বিচার পাবে। একটি ধর্ষক শাস্তি পাবে । দিন ১০ টাকায় বিক্রি করে দিন আপনার বিবেক । আমি যে এই বিবেক খুঁজছি স্যার। আজ আইনজানা শিক্ষিত মানুষের কাছেও বিবেক বিক্রি হচ্ছে খোলা দামে... আসলে এই মেয়েটা কে জানেন? এই মেয়েটা আমার কাকিমা ...  বেশ কিছুদিন আগে আমার কাকিমাকে এই অবস্থা করেছিল, কাকাকে মেরে ফেলেছিল, আর এই ঝিলিক আমার কাকাতো বোন, তাকেও ধর্ষণ করে মেরে ফেলেছে আমার বাবা। গত তিনদিন থেকে লোনের টাকা দিতে পারেনি আমার কাকি। তাই বাবার কাছে টাকার জন্য দেহ বিক্রি করতে এসেছিল। এসে এইভাবে শেষ দেবে... আসলে আমি পাগল নয় স্যার...
পুলিশ - নেতার কাছে আইনের হাত বাধা, তোমার বাবা একটা নেতা। ওরা সব করতে পারে ।। আমি যা করছি আমাকে করতে দাও ভাই, তুমি এখান থেকে যাও।
অজয় - ঠিক আছে স্যার, এবার আমি আইন হাতে তুলে নেব, তখন দেখব আপনার বিবেক কোথায় বিচার করে ...
(অজয় চলে যায়, পুলিশ মেয়েটাকে মঞ্চ থেকে ফেলে দেয়, তার পর ফোন করে)
পুলিশ - হ্যালো নেতা সাহেব, আপনার কাজ সাকসেসফুল। মেয়েটাকে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়েছি, তবে খুব কষ্ট করে। আচ্ছা আপনার ছেলে কি একটা পাগল আছে?  না না ও অনেক বিবেক আবেগ বিচার নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করছিল, লাশটা কোনমতে ছাড়ছিল না। তারপর লাশটাকে ফেলে দিলাম। কী বলেন পাগলটাকে মেরে দিতে হতো ,, এ তো ডেঞ্জার পাগল দেখছি স্যার, ওকে মেরে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
(পুলিশ চলে যায় )


(আকাশ পায়চারি করে, পাশে অনিল, পরে পুলিশ আসে )
আকাশ -  এই টাকাটা রাখো। মেয়েটাকে একেবারে জলে ভাসিয়ে দিয়েছো তো ।।
পুলিশ - হ্যাঁ ।
আকাশ - সাবাস পুলিশ অফিসার। মেয়েটা কি দেখেছেন? সুন্দর জিনিস একটা মাইরি ।।
পুলিশ - নাতো মেয়েটার মুখ আমি দেখিনি।
আকাশ - বেশ করেছেন। এখন কুমিরে মাছে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে হি হি হা হা হাহা।
পুলিশ - এভাবে হাসছেন কেন আমি বুঝতে পারছি না ...
আকাশ - আমি তো সবেতে হাসি, লোককে কাঁদায়। হ্যাঁ আমি সব সময় হাসি হি হি হি হাঁ হা। আপনি এখন বাড়ি যান, আবার আসুন, রাত অনেক হয়ে গেছে।
পুলিশ - ওকে আমি আসছি ।
       ( পুলিশ চলে যায় )
আকাশ -বাড়ি গেলেই বুঝতে পারবি আমার হাসির কারণ কী? আমি তো সবসময় হাসি হি হা হা মেয়েটা তো ছিল। আসলে পুলিশ অফিসারেরই গার্লফ্রেন্ড হি হা হা... নাম আমার আকাশ; এ আকাশের নেই মায়া-মমতা, নেই বিবেক হি হি হা।
(লাইট অফ)


(বিশাল মাতালের প্রবেশ )
বিশাল - ছেড়ে দিলাম আমি আজ থেকে মদ খাওয়া, বিবেক খুঁজে পেয়েছি, বিবেক... গতরাতে যখন একটি নির্যাতিতা মেয়েকে পুকুর পাড়ে ফেলতে গেছিলাম। একটা পুরুষ টাকার বিনিময়ে একটা নারীকে মারতে পারে! সে তো হতে পারে আমার মা। এসব দৃশ্য দেখে আজ আমি মদ ছেড়ে দিয়ে বিবেক খুঁজে পেয়ে গেছি। আজ থেকে ভালো হয়ে গেলাম। আপনারা আমার দিকে কি দেখছেন?  আপনারাও বিবেককে প্রশ্ন করুন আপনি কেমন আছেন, কী করছেন?
(লাইট অফ)


(করিম লটারিতে টাকা পেয়েছে, মঞ্চে দুই তিন দিকে লটারি টেবিল, করিমের গলায় মালা পরানো হচ্ছে,  সবাই হইচই করছে )
দুজন এসে বলে, করিম তোকে তোর মা-বাপ ডাকছে রে, বাড়ি যা।
করিম - হায়রে মানুষের বিবেক! আমি দু'পায়ে চলতে পারি না বলে সবাই আমাকে অবহেলা করেছে। মানুষ তার বিবেককে বিচার করেনি। আমি খেয়ে না খেয়ে কত কষ্ট করে বড় হচ্ছি! দু'বেলা দু'মুঠো ভালো করে বাবা মা খেতে দেয় না আমি দু'পাই অক্ষম বলে। আর আজ আমি এক লক্ষ টাকা জিতেছি বলে সবাই আমার আপন হয়ে গেল! হায়রে বিবেক! সত্যি বিবেক খুঁজতে খুঁজতে মানুষ মরে যাবে। বিবেক খুঁজে পাবে না টাকার কাছে। আজকাল বিবেক বিক্রি হচ্ছে!
(মঞ্চটা করিম করিম জিন্দাবাদ বলতে থাকে। মালা নিয়ে তাকে  কাঁধে তুলে নিয়ে সবাই মঞ্চের বাইরে দিয়ে চলে যায় )


(মঞ্চে উঠে বই দেখে একটি কবিতা পাঠ করে জীবন। পরে অজয় আসে)
অজয় - বৃহৎ  জগত ব্যাপক জটিলতা জীবন যাপনের বিচিত্রতার মাত্রা, মোবাইলদের যুগে এই বয়সে আপনি যে বই পড়ছেন আমি মুগ্ধ হলাম।
জীবন - বই পড়ার সময়সীমা নেই, ৮বছর হোক আর ৮০ বছর হোক .
আমার প্রতিদিন বই না পড়লে ঘুম আসে না।
তাই রাস্তাঘাটে, অবসর সময়ে, রাত্রে ঘুমানোর সময়  আমাকে বই পড়তে হয়।
বই আমার প্রাণ, বই আমার আত্মার আত্মীয়, বই পড়লে অন্ধকার সমাজে আলো ফোটে।
অজয় - হ্যাঁ কাকু বই অন্ধকারে আলো নিয়ে আসে, বই জ্ঞান দেয়, জ্ঞান শান্তি নিয়ে আসে সমাজে।
জীবন- বই পড়া সমাজ থেকে উঠে যাচ্ছে বলেই তো শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে সমাজের, মানুষ বই পড়ুক, শান্তি ফিরে আসবে সমাজে।
অজয় - শান্তি! শান্তি যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
জীবন - এই বই শান্তি বিবেক জাগ্রত করে।
অজয় - বিবেক যে আমি কবে থেকেই খুঁজছি, তবু খুঁজে পাচ্ছি না।
জীবন - বিবেক খুঁজে পাবে কী করে? বিবেক আজ অনেকের কাছে মারা গেছে। আচ্ছা তুমি কে বল তো?
অজয় - আমি যে বিবেকের খোঁজে পাগল হয়ে গেছি।
আমি বিবেকের আশায়,, আমি যাই আমি যাই।
( চলে যায় অজয়)
জীবন - বিবেক খুঁজি। এই মোবাইলের যুগে মানুষ যদি বই পড়ে অভ্যাস না করে, আমাদের প্রজন্ম অন্ধকারে ঢেকে যাবে।
তাই বই পড়ুন, সুস্থ সমাজ গড়ুন। বিবেক পাবেন, শান্তি পাবেন।।
( লাইট অফ)

১০
(আকাশ ও অনিল পায়চারি করে। পরে অজয় আসে হাতে একটি লাঠি নিয়ে)
অজয় - এই অমানুষ তোকে এবার আমার হাতে মরতে হবে । এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
আকাশ - অজয়, তুই আমার ছেলেরে। আমাকে মারবি কেন?
অজয় - তোর তো বিবেক নেই, আমার মাকে মেরেছিস। কত মায়ের কোল খালি করেছিস! অসহায় মানুষের পেটে লাথি মেরেছিস। তোর জন্য কত বাবা জেলে পুড়ে পচে মরছে। তোকে মারা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
আকাশ - তোর বিবেক বুদ্ধি কি নেই?
অজয় - এই শালা বাপ, তোর মুখ থেকে বিবেক কী করে বেরোলো? বিবেক থাকলে তুই নারী নির্যাতন করতিস? অসহায় মানুষের পেটে লাথি মারতিস? বিবেক থাকলে তার স্ত্রীকে মেরে নিজেই নাটক জমাতে পারতিস?  বিবেক থাকলে পুলিশ অফিসারের গার্লফ্রেন্ডকে মারতে পারতিস?  বিবেক থাকলে এত টাকার মালিক হতে পারতিস না। মর আমার হাতে।
(অজয় আকাশকে মারতে থাকে। আকাশ একপর্যায়ে প্রায় মরে যাবে মরে যাবে এমনি সময় পুলিশ আসে )

পুলিশ - দাঁড়াও ওকে মেরো না, ওকে আইনের হাতে তুলে দিতে দাও,  সারা জীবন কষ্টে মরবে শালা।
অজয় - সেদিন রাতে আপনাকে বলেছিলাম স্যার, আপনি বিবেক বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আজ হঠাৎ আপনার বিবেক খুললো কী করে? বিচার চাইছেন মানে, আইন দেখাচ্ছেন মানে, বুঝতে পেরেছি পুলিশের গার্লফ্রেন্ডকে মেরেছে বলে ,, অন্যের মাটা কারো গার্লফ্রেন্ড নয়, কারো স্ত্রী নয়, কারো বোন নয়, আপনারা বিবেক বিক্রি করে আইনও বিক্রি করে দিচ্ছেন স্যার।
পুলিশ - এখন জ্ঞান দেওয়ার সময় নয়, আমার জ্ঞান খুলে গেছে, আমার বিবেক হয়ে গেছে, আমি বিবেক খুঁজে পেয়েছি, ভাই চুপ কর।
(অজয় পুলিশের কথা শুনতে শুনতে পুলিশের কোমর থেকে পিস্তূল কেড়ে আকাশের পেটে গুলি, অনিলের পেটে গুলি)
অজয় - এবার সব মানুষ বিবেক খুঁজে পাবে; আমিও বিবেক খুঁজে পেয়ে গেছি ।।
পুলিশ - এটা কী হলো ভাই?
অজয় - বিবেক বিবেক।
পুলিশ - এবার তোমাকে প্যারিস করতে হবে; তুমি জানতো দুটো মানুষকে মেরেছ আইনের চোখে অপরাধী তুমি।
অজয় - এত অপরাধীকে এতদিন আপনারা অ্যারেস্ট করেননি কেন?  এবার ভাবছি আপনাকেও আমি গুলি করব।  কারণ আইন-বিবেককে বেশি চিবিয়ে খেয়েছেন আপনারা, নেতাদের আশ্রয় দিচ্ছেন আপনারা, আপনাকে গুলি করব।
পুলিশ - সত্যি বলছি ভাই গতরাত থেকে আমার সব দিনের মতো পরিস্কার হয়ে গেছে। আমি বিবেক খুঁজে পেয়েছি।
অজয় - সত্যি বলছেন? আজকের পর আর বিবেক বিক্রি করবেন না তো?  আইন বিক্রি করবেন না তো? ন্যায় বিচার করবেন  তো?
যাই করুন বিবেক দিয়ে করুন। আসলে আমি পাগল নই স্যার,  আমার পাগলামি ছিল ন্যায়বিচার, আমার পাগলামি ছিল বিবেক, আমার পাগলামি ছিল অসহায় মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়া, আমার পাগলামি ছিল নেতাদের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়া, আমার পাগলামি ছিল আইনের রক্ষক হয়ে ভক্ষক হওয়া মানুষদের শিক্ষা দেওয়া, আমার পাগলামি ছিল মানুষকে সঠিক পথ দেখানো, আমার পাগলামি ছিল বিবেক জেগে উঠুক প্রতিটি মানুষের অন্তরে।। আমিও সারা জীবন বিবেক খুঁজি, বিবেক খুঁজি।
                          ...............

                           সমাপ্ত

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url