প্রবন্ধ: দৃষ্টিভঙ্গির আয়নায় নারী, রচনায় : প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল
প্রবন্ধ: দৃষ্টিভঙ্গির আয়নায় নারী
রচনায় : প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল
পিএইচ.ডি. (ঢাবি), বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)
কবি, লেখক, গীতিকার, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ
মানবসভ্যতার ইতিহাস এক অর্থে দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস, আমরা কাকে কীভাবে দেখি, সেটিই নির্ধারণ করে আমাদের আচরণ, সংস্কৃতি এবং সমাজব্যবস্থা। নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রশ্নটি তাই শরীরের নয়, প্রশ্নটি দৃষ্টির; প্রশ্নটি আকর্ষণের নয়, বরং উপলব্ধির গভীরতার।
মানুষের মধ্যে আকর্ষণ একটি প্রাকৃতিক প্রবণতা, এটি সৃষ্টি-প্রকৃতির সহজাত নিয়ম। তবে যখন এই স্বাভাবিক আকর্ষণ সীমা অতিক্রম করে একপাক্ষিক দৃষ্টিতে পরিণত হয়, তখন তা আর সৌন্দর্যের নয়, বরং বিকৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রাচীন এক বাণীতে বলা হয়, “যে দৃষ্টি সম্মান হারায়, সে দৃষ্টি অন্ধ হয়ে যায়”। এই অন্ধত্বই আজ আমাদের সমাজের এক গভীর সংকট।
আমাদের সমাজে ছেলেশিশুর মানসগঠনের ভিতেই প্রায়শই একটি দ্বৈত শিক্ষা ঢুকে যায়। একদিকে নারীকে ‘গোপন’ ও ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে দেখানো হয়, অন্যদিকে তাকে ‘আকর্ষণের বস্তু’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই দ্বন্দ্বময় শিক্ষাই তৈরি করে এক বিভ্রান্ত মানসিকতা। রুবাইয়াত -ই- মোস্তফা দুলাল প্রথম খন্ড ২০২৬-এ কবি প্রশ্ন তুলেছেন-
মা ভগ্নি প্রেয়সী পত্নী, সবই কিন্তু নারীরা হয়,
যখন যেমন তেমন রূপে, সাজে তারা মহিমা ময়।
গর্ভ মাঝে সন্তান জন্মায়, স্তন দানে পালন করে,
দশ সমাজে নারী-পুরুষ, বৈষম্যটা কেন টিকে রয়?
ফলে, নারীকে মানুষ হিসেবে বোঝার পরিবর্তে, তাকে একটি রহস্যময় বস্তু হিসেবে কল্পনা করা শুরু হয়।
যা লুকানো হয়, তা নিয়ে কৌতূহল জন্মায়, এটাই মানবমনের স্বাভাবিক প্রবণতা। যখন সেই কৌতূহলকে জ্ঞান ও সংবেদনশীলতার আলোয় পরিচালিত করা হয় না, তখন তা ভুল পথে প্রবাহিত হয়। তখন দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে সংকীর্ণ, আর সম্পর্ক হয়ে ওঠে ভঙ্গুর।
নারীর শরীরকে কেন্দ্র করে যে অতিরিক্ত সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, তা অনেক সময় বিপরীত ফল বয়ে আনে। সমাজ যখন একটি বিষয়কে অতিরঞ্জিতভাবে আড়াল করে, তখন সেটি স্বাভাবিকতার পরিসর হারায়। ফলে মানুষ সেটিকে আর সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। এই প্রসঙ্গে একটি গভীর সত্য উচ্চারণ করা যায়, “স্বাভাবিকতাকে অস্বাভাবিক করলে, অস্বাভাবিকতাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে”।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় গণমাধ্যমের প্রভাব। বিজ্ঞাপন, সিনেমা, বিনোদন, সবখানেই নারীকে প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বন্দি করে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে তার বুদ্ধিমত্তা, তার স্বপ্ন, তার সংগ্রাম, সবকিছু আড়ালে পড়ে যায়; সামনে আসে কেবল তার বাহ্যিক রূপ। এই একমুখী উপস্থাপন সমাজের চেতনায় ধীরে ধীরে এক বিপজ্জনক ধারণা স্থাপন করে, নারী মানেই শরীর।
রুবাইয়াতের রশ্মি দ্বিতীয় খন্ড, ২০২৬ এ অবহেলার সমাধিতে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলে অবহেলিত নারীকে কবি সমাজে মাথা তোলে দাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন-
নারী তুমি কবিতা, নিজ জাতের পূজিতা,
জ্ঞান গরিমায় যেন তুমি, নজরুলের সঞ্চিতা।
অবহেলার সমাধিতে, জ্ঞানের পিদিম জ্বেলে,
তোলো মাথা দাড়াও পায়ে, রবে না বঞ্চিতা।
প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতা ভিন্ন। নারী একটি পূর্ণাঙ্গ মানবসত্তা, তার অনুভূতি আছে, চিন্তা আছে, স্বপ্ন আছে, অধিকার আছে। তাকে যদি কেবল শরীরের সীমায় আবদ্ধ করা হয়, তবে তা কেবল তার প্রতি অবিচার নয়; বরং মানবতার প্রতি এক গভীর অবমাননা।
সমাজবিজ্ঞান বলে, মানুষ যেমনভাবে শেখে, তেমনভাবেই সে আচরণ করে। তাই এই সমস্যার মূলেও রয়েছে শিক্ষার ঘাটতি, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বরং মূল্যবোধের শিক্ষা। পরিবারই এই শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। একটি ছেলে যদি ছোটবেলা থেকেই শিখে যে নারী তার মতোই একজন মানুষ, যার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সীমা ও সম্মান রয়েছে, তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি স্বাভাবিকভাবেই মানবিক হয়ে উঠবে।
একটি প্রবাদ আছে, “গাছের যত্ন নিলে ফল মিষ্টি হয়”। ঠিক তেমনি, মানসগঠনের প্রাথমিক যত্ন যদি সঠিকভাবে নেওয়া হয়, তবে সমাজও সুস্থ ও সুশৃঙ্খল হবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব অপরিসীম। একটি রাষ্ট্র তখনই উন্নত হয়, যখন তার নাগরিকরা পরস্পরের প্রতি সম্মান ও সমানাধিকারের চেতনা ধারণ করে। নারী যদি সেখানে অবমূল্যায়িত হয়, তবে সেই সমাজ কখনোই পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে না। কারণ উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোর নয়; এটি মননেরও।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নারীর মর্যাদা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যখন নারীকে কেবল ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হয়, তখন তার কর্মক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দূরদর্শিতা ও সৃজনশীলতা উপেক্ষিত হয়। ফলে সমাজ তার অর্ধেক শক্তিকে হারায়। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সঙ্গত কারণে কবি প্রফেসর ড. মোস্তফা দুলাল তাঁর রুবাইয়াত গ্রন্থের প্রথম খন্ড ২০২৪ এ বলেছেন-
পুরুষ নারী মিলেমিশে, সংসার যাত্রায় বধু আর বর,
ঘরে বাইরে কর্ম করে, বান্ধে ফেলে সুখ শান্তির ঘর।
জন্মসূত্রে রক্তমাংসে, কর্ম-কাজে সবাই সমান,
উন্নয়নের ফুটায় পুষ্প, অর্ধেক নারী অর্ধেকটা নর।
এই বাস্তবতায় আমাদের প্রয়োজন একটি নৈতিক পুনর্জাগরণ, একটি দৃষ্টিভঙ্গির বিপ্লব। যেখানে নারীকে দেখা হবে একজন সহযাত্রী হিসেবে, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; একজন মানুষ হিসেবে, বস্তু নয়।
রম্য একটি উপমা দিয়ে বলা যায়, মানুষের দৃষ্টি একটি আয়নার মতো। সেই আয়না যদি ধুলোয় ঢাকা থাকে, তবে প্রতিচ্ছবিও ঝাপসা হবে। তাই প্রথমেই প্রয়োজন সেই আয়নাকে পরিষ্কার করা, অর্থাৎ নিজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে শুদ্ধ করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আকর্ষণ একটি অনুভূতি, কিন্তু সম্মান একটি সিদ্ধান্ত। অনুভূতি আসতে পারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কিন্তু সম্মান দিতে হয় সচেতনভাবে। “সম্মান যেখানে থাকে, সম্পর্ক সেখানে টিকে থাকে”, এই সহজ সত্যই আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারে।
পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে ছোট ছোট পদক্ষেপ থেকে। পরিবারে সমান আচরণ, শিক্ষায় সংবেদনশীলতা, গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল উপস্থাপন, এই সবকিছু মিলেই তৈরি করতে পারে একটি সুস্থ সমাজ।
উপসংহার
নারীর শরীর নয়, তার মানবিক সত্তাই হওয়া উচিত আমাদের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। কারণ শরীর ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানবতা চিরস্থায়ী।
আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে গড়ে তুলি, যেখানে আকর্ষণ থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে সম্মান; কৌতূহল থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে উপলব্ধি; সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু তার ভিত্তি হবে মানবতা।
কারণ শেষ পর্যন্ত সত্য একটাই,
যে সমাজ নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য হয়ে ওঠে।
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,
সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট আইনের সর্ব স্বত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত,
