গল্প - বৈপরীত্য, কলমে - জিয়াউর রহমান

 


বৈপরীত্য

 জিয়াউর রহমান


শুরু হয়েছে আকাল। সবকিছুই এখানে এখন অপ্রতুল। এখানকার মানুষ কী খাবে, কী পরবে, কোথায় থাকবে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। গাজার সর্বত্র একই ছবি। সৌজন্যে ইজরাইলি দখলদারবাহিনী। হাসপাতালগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। সেখানে না আছে পর্যাপ্ত বেড, আর না আছে ওষুধপত্র। অক্সিজেন সরবরাহ তথৈবচ। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। জেনারেটর থাকলেও পর্যাপ্ত জ্বালানী তেলের অভাবে সেগুলো ধুঁকছে। মোটের উপর গাজার মানুষের চিকিৎসাব্যবস্থা একরকম লাটে ওঠার উপক্রম।


রাফা সীমান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে শয়ে শয়ে ট্রাক। তাতে খাবার-দাবারের পাশাপাশি রয়েছে ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম। গেল কয়েকদিন ধরে সীমান্ত পাহারারত ইজরাইলি সেনারা ট্রাক ঢুকতে বাধা দিচ্ছে। যার যেরে এই দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ক্রমাগত বিমান হামলার দরুন রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইজরাইলি হামলার শিকার হয়ে কাতারে কাতারে লোক আহত হয়ে ভর্তি হচ্ছে। তার মধ্যে শিশুর সংখ্যাটা প্রায় অর্ধেক। কারও হাত নেই, কারও বা পা নেই। কারও মুখ বেয়াকার হয়ে গেছে, চেনার উপায় নেই। সে এক বীভৎস অবস্থা।

একেবারে অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়।


দেইর আল বালাহর সুহাদা আল আকসা হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক ইয়াসির আলি। এদের চিকিৎসা করতে গিয়ে ডা আলির হিমশিম খাওয়ার দশা। দিনরাত এক করে তিনি চিকিৎসা পরিষেবা দিয়েই চলেছেন। এতটুকু গাফিলতি নেই। তথাপি প্রতিদিন তাঁকে দেখতে হচ্ছে লাশের সারি। চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে একের পর রোগী। হয়ত পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম বা ঔষধ থাকলে আরও অনেককে বাঁচানো সম্ভব হত। কিন্তু তা হচ্ছে না। আর যারা ভাগ্যের জোরে বেঁচেবর্তে আছে তাদের অবস্থা চোখে দেখার মত নয়। এদের দুরবস্থা দেখলে চোখের জল ধরে রাখা যাবে না।


এইমাত্র একটি শিশুর চিকিৎসা করে সবে একটু টেবিলে বসেছেন ডা আলি। ছুটে এল সোফিয়া। হাসপাতালের নার্স। স্যার আয়ানের অবস্থাটা কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। একটু আগেই বাচ্চাটা কেমন নড়াচড়া করছিল। হঠাৎ কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে। কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি না। নাকে হাত দিয়ে দেখলাম কিন্তু নিশ্বাস-প্রশ্বাসের কোন লক্ষণ পেলাম না। মনে হয় বাচ্চাটা মারা গেছে। আপনি একটু দেখবেন?


তৎক্ষণাৎ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ চল, বলে দ্রুতপদে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। মুহুর্তেই সোফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এসে দাঁড়ালেন আয়ানের কাছে। না নাড়িতে কোন স্পন্দন নেই। সত্যি সত্যি বাচ্চাটা মারা গেছে। একেবারে যেন ফুলের মত একটা শিশু। এরকম শতশত শিশু প্রতিদিন ইজরাইলি বিমানের আঘাত সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এর কোন প্রতিকার নেই। সারা বিশ্ব নির্বিকার।


যাও সোফিয়া বাইরে এর কোন আত্মীয় স্বজনকে খবরটা দাও। এখান থেকে একে নিয়ে যেতে বল।


আয়ানের বাড়ির কেউ আছেন এখানে?


হ্যাঁ মাডাম আছি। কী খবর ম্যাডাম, আয়ানের অবস্থার কী একটু উন্নতি হয়েছে?


না না, আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আয়ান আর নেই। সে আপনাদের ছেড়ে চলে গেছে। আপনারা আমার সাথে আসুন লাশটা নিয়ে যান।


চোখ মুছতে মুছতে ভেজা গলায় আয়ানের বাবা জানাল, কোথায় নিয়ে যাব ম্যাডাম, আমাদের নিজেদেরই তো কোথাও কোন ঠাঁই নেই। যাহোক করে খড়কুটো আঁকড়ে থাকার মত এই হাসপাতালের বাইরের চত্বরে তাঁবু খাঁটিয়ে কোনরকমে দিনাতিপাত করছি। এ অবস্থায় কোথায় নিয়ে যাব ওকে?


তা বললে কি হয় বলুন? অন্ততপক্ষে লাশটাকে নিয়ে নিকটবর্তী কোন গোরস্তানে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করুন। প্রতিদিন এত এত সংখ্যক রোগী মারা যাচ্ছে যে হাসাপাতালের মর্গে আর তিল ধারণের মত জায়গা নেই।


কাঁদোকাঁদো গলায় বললেন, দেখছেন তো ম্যাডাম, বাইরে সর্বত্র কী হারে বোমা পড়ছে। এখান থেকে বেরোনোর মত উপায়  আছে? গাজার এক চিলতে জায়গা নেই যেটা ইজরাইলি হানাদারদের হাত থেকে রেহাই পায়। তারা সর্বত্র বোমা নিক্ষেপ করছে। বিদ্যালয়, হাসপাতাল, মসজিদ, গির্জা এমনকি সমাধিক্ষেত্র কোন কিছুই তাদের নিঠুর বোমার আঘাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এপরিস্থিতিতে কোথায় নিয়ে যাব বলুন? দয়া করে দুটো একটা দিন একটু মর্গে যেকোনভাবে রেখে দিন, তারপর পরিস্থিতি একটু ভাল হলে না হয় আমরা আয়ানকে এখান থেকে নিয়ে কোথাও কবরস্থ করার ব্যবস্থা করব ম্যাডাম।


স্যার আয়ানের বাড়ির লোকেদের সাথে কথা বললাম। কিন্তু তাদের পক্ষে এখন এই লাশ নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আসলে বাইরে যে হারে বোমা পড়ছে তাতে তাদের বেরোনোর মত পরিস্থিতি নেই। লাশ কবরস্থ করতে গেলে নিজেরাই লাশ হয়ে ফিরবে। তাই আপাতত মর্গে রাখা ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।


ঠিক আছে, তাহলে সামসুলকে ডাক। সে এসে লাশটা মর্গে নিয়ে যাক।


সোফিয়া ছুটল সামসুলকে খুঁজতে।


এদিকে আয় সামসুল, এই বাচ্চার লাশটা মর্গে নিয়ে রেখে দে ডাক্তারবাবু বললেন।


ঠিক আছে স্যার নিয়ে যাচ্ছি।


সামসুল চলল লাশটাকে মর্গে রাখতে। কিন্তু মর্গে তিল ধারণের জায়গা নেই। সেখানে মেরেকেটে ১০ টা লাশ রাখার মত জায়গা আছে। অথচ রাখা হয়েছে বিশটা লাশ। এক্কেবারে ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। সেখানে রাখার জায়গা না পেয়ে সে ফিরে এল বাইরের তাঁবুতে। বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বাইরের তাঁবুতে ২০ থেকে ২৫ টা লাশ রাখার মত ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু না এখানেও একই অবস্থা। গাদাগাদি করে ৪০ টার মত লাশ রাখা হয়েছে। আর একটাও রাখার মত স্থান নেই। তাই শেষমেষ নিতান্ত বাধ্য হয়েই সামসুল ফিরে এল ডাক্তারবাবুর কাছে।


কীরে ফিরে এলি যে, লাশটা কোথাও রাখার ব্যবস্থা করা গেল না। বাইরের তাঁবুতে দেখেছিস জায়গা আছে কীনা?


দেখেছি ডাক্তারবাবু। কিন্তু সেখানেও রাখার মত এতটুকু জায়গা ফাঁকা নেই।


গ্রাউণ্ড ফ্লোরের বামদিকের একেবারে ধারের যে গোডাউনটা রয়েছে সেখানে গিয়ে দেখ রাখার মত কোন খালি জায়গা আছে কীনা?


সামসুল যথারীতি সেখানে হাজির হল। কিন্তু কই সেখানে তো কোনো ফাঁকা জায়গা নেই যেখানে আয়ানের লাশটা রাখা যেতে পারে। গোডাউনের মধ্যে রাখা আছে একটা বিশাল আকারের আইসক্রিম ফ্রিজার ট্রাক। একাই দখল করে আছে পুরো গোডাউনটা। যার বাইরের গায়ে শিশুদের আইসক্রিম খাওয়ার ছবি বিজ্ঞাপন আকারে সাঁটানো আছে। সে ভেবেই পেল না বৃহদাকার হাতির মত এই ট্রাকটি কেন এখানে রাখা হয়েছে। কোন জায়গা না দেখতে পেয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়ে আবার সে ফিরে এল ডাক্তারবাবুর কাছে।


কী এবারে আয়ানের লাশটা রাখতে পেরেছো সামসুল?


নাতো।


কেনো ওই গোডাউনে শিশুর লাশ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে তো। তুমি খুঁজে পাওনি?


সেখানে গেলাম তো কিন্তু কই কোন ফাঁকা জায়গা তো পেলাম না। পুরো গোডাউন জুড়ে বসে আছে একটা বড় আকারের আইসক্রিম ফ্রিজার ট্রাক। এছাড়া আর কোন কিছু সেখানে দেখলাম নাতো।


    আরে ওইটাই তো গতকাল রাতে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে মরদেহ রাখার জন্য। এগুলো সাধারণত সুপার মার্কেটে ডেলিভারীর কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু এখন কোন উপায় না পেয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা করে এই ট্রাকটাকেই আনা হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত মরদেহগুলোকে রাখার ব্যবস্থা করা যাবে বুঝলি।


সামসুল ডাক্তারের কথা শুনে একেবারে থ বনে গেল। আইসক্রিম ফ্রিজারে রাখতে হবে শিশুদের লাশ এটা ভেবে তার সারা শরীরে কেমন যেন কাঁটা দিয়ে উঠল। তথাপি সে গুটিগুটি পায়ে আয়ানের লাশটা নিয়ে চলে এল ওই আইসক্রিম ফ্রিজার ট্রাকের সামনে। প্রথমবার সে ভালো করে ফ্রিজারটা দেখে নি। এবার সে ফ্রিজারের দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে তার আদ্যোপান্ত ভাল করে দেখছে। বড় আকারের এই ফ্রিজারের গায়ে সাঁটানো রয়েছে লাল সাদা রঙের এক বিজ্ঞাপন যার একদিকে রয়েছে এক আইসক্রিম ওয়ালা রঙ বেরঙের আইসক্রিম নিয়ে আর অন্যদিকে রয়েছে ছোটোছোটো গুটি কতক বাচ্চার ছবি। এদের মধ্যে দুটি বাচ্চা তার কাছ থেকে আইসক্রিম কিনে নিয়েছে যার একজন খাচ্ছে আর অন্যজন সবেমাত্র হাতে পেয়েছে। আরো দুজন হাতে টাকা নিয়ে আইসক্রিম ওয়ালার এক্কেবারে কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা যেন আইসক্রিম পাওয়ার জন্যে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছে। বাদবাকি কয়েকজন পড়িমরি করে ছুটে আসছে আইসক্রিম ওয়ালার দিকে। এত জোরে ছুটছে যেন তারা দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাদের প্রত্যেকের মুখে হাঁসির ফোয়ারা। আসলে বিজ্ঞাপনের এই ছবি দেখে শিশুরা আনন্দে বাগবাগ হয়ে যায় আর আইসক্রিম খাওয়ার জন্যে বায়না ধরে।


সামসুল আজ যেন আবেগের বানে ভেসে যেতে বসেছে। সে একবার এই ছবিগুলোর দিকে তাকাচ্ছে আর একবার নিজের হাতে ধরা সাদা কাপড় জড়ানো আয়ানের দিকে তাকাচ্ছে। সেই কবে থেকে সে এই হাসপাতালে মর্গে লাশ রাখার কাজ করেই চলেছে। নিত্যদিন লাশ নিয়ে নাড়াচাড়া করে করে তার কোন আবেগ আর কাজ করে না। কালক্রমে সে অনেকটা পাথরের মত শক্ত হৃদয়ের মানুষ হয়ে উঠেছে। অথচ আজ এই আইসক্রিম ফ্রিজারে লাশ রাখতে এসে বিজ্ঞাপনে শিশুদের হাসিমুখের ছবি দেখে তার ভাবনার জগতে ঢেউ উঠল। যে ছবি দেখে এই গাড়ির কাছে হাসতে হাসতে ছুটে আসে শিশুর দল আজ সেই গাড়ির মধ্যে রাখতে হবে সেই শিশুর মরদেহ। এ এক ভয়ানক দৃশ্য। শক্ত পাথরের বক্ষ ভেদ করে আসা ঝরণার মত সামসুলের চোখ ফেটে হুড়হুড় করে বেরিয়ে এল অশ্রু।।। সমাপ্ত।।



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url