প্রবন্ধ - মানবতাবাদী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়, লেখক - ড. মনোরঞ্জন দাস












মানবতাবাদী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়

ড. মনোরঞ্জন দাস


          মানবতাবোধ এবং সুকর্মের মধ্য দিয়েই জীবনের উৎকৃষ্টতা  ও মহত্বের পরিচয় পাওয়া যায় এবং তা ইতিহাসের পাতায় চিরবিদ্যমান ও সাক্ষী হয়ে থাকে। এমনই একজন ব্যক্তিত্ব হলেন ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়, যিনি তার সুনিপুণ কর্মের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেনও অনন্তকাল।


        ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় (১৮৮২-১৯৬২) ছিলেন একজন কিংবদন্তি চিকিৎসক, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার। চিকিৎসা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৬১ সালে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'ভারতরত্ন' দেওয়া হয়। ১লা জুলাই তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী, যা ভারতে 'জাতীয় চিকিৎসক দিবস' হিসেবে পালিত হয়। 


       তাঁর বর্ণময় জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হলো:

         চিকিৎসা জীবন ও মানবতাময় কর্মে

ধন্বন্তরি ছিলেন তিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসাধারণ দক্ষতার জন্য তাঁকে 'ধন্বন্তরি' বলা হতো; রোগীদের শারীরিক অবস্থা দেখেই তিনি রোগের নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে পারতেন। 


   মানবতার প্রকল্পণে, অনেক সময় তিনি বিনা পারিশ্রমিকে গরিব রোগীদের চিকিৎসা ও ওষুধ দিতেন। তাঁর চেম্বারের বাইরে অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। 

একটি কবিতা,


' মানবতার মন্থনে এই

 তোমার  নাম, এই নামাঙ্ক ন

                     এই নামাবলী।


তোমারই সংগত সত্যে

 শুদ্ধ ময়  সাজুকতা

ধরণে  ও ধারণে থাকে

               উপজীব্য

                 সমীপ্য।

এখানেই তোমার অধিকার

                          পরিসর

পরোপকারে

সবিস্তারে।


তোমার বিকাশে ছিল নবযুগের প্রভাত ,

ছিল সবই আলোকিত

তুমি তো জীবন তর্পণে ছিলে

                এক  সাধক

      এককলব্ধ সন্ন্যাসী।'


       রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

          ১৯৫০ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু (১৯৬২) এই পদে বহাল ছিলেন।

    রাজ্য গঠন, দেশভাগের পর উদ্বাস্তু সমস্যা ও চরম খাদ্য সংকটে জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গকে তিনি শক্ত হাতে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তাছাড়া

শিল্পায়ন ও উন্নয়নে,  দুর্গাপুর, কল্যাণী এবং বিধাননগর (সল্টলেক)-এর মতো আধুনিক শহর ও শিল্পাঞ্চল তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। 


         

         তার শিল্পায়ণ ভাবনা নিয়ে একটি কবিতা,


' সমাহারে চাই শিল্পায়ণ ,

তুমি বুঝেছিলে

তুমি মেনেছিলে

চর্চায়, আয়োজনে

             সংস্পর্শণে

        এবং সংবিধানে।


তোমার তর্পণে আর অর্পণে

এই দেশ

এই বঙ্গ।


কৃষির সাথে শিল্পের

সমান্তরালে চাই উন্নয়ন ণ,

এইই ছিল তোমার মনন অভিলাস

প্রিয় বিশ্বাস।


প্রাণাধারে আজও আছো,

                       থাকবেই

যতদিন আছে এই দিন-মান

                সর্বাঙ্গীন।'



      শিক্ষাবিদ ও প্রতিষ্ঠান নির্মাতা হিসাবে 

কলকাতায় বেশ কয়েকটি বিখ্যাত চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে তাঁর সরাসরি অবদান ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো;

চিত্তরঞ্জন সেবা সদন

আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,

লেডি ব্রেবোন হাসপাতাল।

তিনি অনুভব করেছিলেন, তাই তো বলা চলে,

        ' সেইকালে দেশে সুচিকিৎসার অভাবে বহু মানুষ নানাবিধ দুরারোগ্য রোগে প্রাণ হারাত। দেশে শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসকদেরই দাপট। কিন্তু ক'জন আর তাদের কাছে পৌছতে পারে।

       ' চিকিৎসা ক্ষেত্রের এই দুরবস্থা বিধানচন্দ্রকে পীড়িত করত। তাই চিকিৎসাশাস্ত্রে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে তিনি বিলাত যাত্রা করেন ১৯০৯ সালে। সেখানে দুই বছর থেকে এম. আর. সি.পি. এবং এম. আর. সি. এস.এবং পরে এফ. আর. সি. এস. উপাধি অর্জন করেন।

      'বর্তমানে যেটি নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ, সেকালে তার নাম ছিল ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুল। বিলাত থেকে ফিরে এসে বিধানচন্দ্র এখানে চিকিৎসকরূপে যোগদান করেন। সেই সঙ্গে নিজেও চিকিৎসা ব্যবসা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সুচিকিৎসকরূপে তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেই সঙ্গে দেশের সমাজ জীবনের সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরী হতে থাকে।'

         

          ডঃ বিধান চন্দ্র রায়- এর চিকিৎসাজীবনের দুটি  অসামান্য ঘটনা আপনাদের বলি;

 

       বিধান চন্দ্র রায় এর কাছে একজন সম্ভ্রান্ত দম্পতি এলেন চিকিৎসা করাতে ।সমস্যা হল গিয়ে মহিলাটির মাথায় অসম্ভব যন্ত্রনা ।বেশ কয়েক নামীদামী ডাক্তার ,নামী হসপিটাল ঘুরে ঘুরে ধৈর্য্য যখন একেবারেই শেষ ,সব আশাই ছেড়ে দিয়েছেন স্ত্রী মাথার যন্ত্রনার অবসান ঘটাতে ,সেই সময় এলেন বিধান চন্দ্র রায় এর চেম্বারে ।দেখালেন দেশ বিদেশ থেকে আনা নানা পরীক্ষার রিপোর্টও। ডঃ বাবু ওসব দিকে বিশেষ নজর দিলেন না ।বেশ কিছুক্ষন মহিলার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললেন ,সেরে যাবে কিছুদিনের মধ্যেই।ভদ্রলোক ভাবলেন সব ডাক্তালই তো বলেন ইনিও বলছেন। অবাক হয়ে দেখলেন ডাঃ বাবু কোন প্রেসক্রিপসন দিলেন না, আর কোন ওষুধও দিলেন না  ।বিধান বাবু বললেন ,এবার আপনারা আসুন ।দম্পতি তো হতবাক একে অপরের দিকে চাওয়া চাও-ই করছেন ।তাদের অবস্থা দেখে মৃদু হেসে চেয়ার খেকে মাথাটা এগিয়ে এনে মহিলাকে বললেন, আপনি একটা কাজ করুন ।মাথায় ঐ সিন্দুর পরাটা কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে দিন।


       এর ঠিক মাস দুই পরে সেই দম্পতি এসে হাত জড়ো করে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় কে বললেন একান্ত অনুগত হয়ে, গদগদ স্বরে বললেন, আপনি ছিলেন বলেই আমার মিসেস এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন।


          আসলে মহিলার মারকিউরাস ঘটিত একপ্রকার এলার্জি ছিল ।যার কারনেই সিঁদুর পরলেই মাথার যন্ত্রনা হত। মহান ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় এক লহমায় দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন॥



               একবার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন দপ্তরে কাজ করছেন ।হঠাৎ কি মনে হল বেহারা দিয়ে চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী এক ঝাড়ুদারকে ডেকে পাঠালেন ।ঝাড়ুদার তো বুঝলেন নির্ঘাত আমার চাকরি গেল।কেবিনে ঢুকেই হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করলেন, বললেন, 'স্যার বাড়ীতে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা আছে ।' 

     ডঃ রায় তাকে তুলে নিয়ে বললেন সেজন্যই তো ডেকে পাঠালাম।বলি, কাশিটা কতদিন ধরে চলছে।তোমার তো টিবি হয়েছে।


       দপ্তরের থেকে কেবল কাশির আওয়াজ শুনেই রোগ ধরে ফেলে ছিলেন ডঃ বিধান চন্দ্র রায় । ঐ ঝাড়ুদারকে ঔষুধ   পথ্য ও দিলেন।দপ্তরের বাকী লোকজন তো তাজ্জব বনে গেলেন। 


         তার কর্মময়ের অনুধ্যানকে স্মরণ করে একটি ছড়া দিয়ে শেষ করি,


' তোমারই অমূল্য কর্মে

তুমি বিধানচন্দ্র,

হয়ে আছো আঁধার রাতে

একা পূর্ণিমা-চন্দ্র।।


মহান প্রয়োগে  তোমার ই

অনন্য সব কর্ম,

একাকার হয়ে আছে,

সে-ই তোমার ধর্ম।।


সর্ব বিষয়ে ছিলে তুমি

অতি বড় জ্ঞানী

সেকথাই আমরা সবাই

নিয়েছি যে মানি।।


তোমারই কৃতকর্মে জানি

তুমি দেশভক্ত,

পরোপকারে তুমি ছিলে

বেশ অনুরক্ত।।


সর্ববিধানে ছিলে তুমি

সম্পদ দেশের,

ডাক্তার বড় তুমিই যে,

প্রিয় বড় মোদের।।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url