খালওয়ার অন্তরালে : রূহের, কলমে - সাইদা সারমিন

 











খালওয়ার অন্তরালে : রূহের
আন্তর্জাতিক সুফি কবি সাইদা সারমিন 

রাত্রির গভীরতম নির্জনতায়,
যখন দুনিয়ার সমস্ত শব্দ ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছিল,
আমি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম এক নীরব খালওয়ার অন্তরালে।
সেই নির্জনতা ছিল না শুধু একটি ঘরের নিস্তব্ধতা;
সেটি ছিল আত্মার এক দীর্ঘ সফর—
সৃষ্টির কোলাহল থেকে স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার এক গোপন হিজরত।
সেই রাতে মানুষের কোনো আহ্বান ছিল না,
ছিল না প্রশংসার মায়াবী শব্দ,
ছিল না অভিযোগের ভারী ছায়া।
শুধু ছিল আমার ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত, পথহারা রূহ,
আর ছিল তোমার নীরব, অথচ সর্বব্যাপী উপস্থিতি।
আমি সিজদায় লুটিয়ে পড়ে বুঝেছিলাম—
মানুষের সামনে শক্ত থাকার অভিনয় যত সহজ,
তোমার সামনে ভেঙে পড়া ততটাই কঠিন।
কারণ তোমার দরবারে মুখোশের কোনো মূল্য নেই।
সেখানে চোখের জলও মিথ্যা বলতে পারে না।
সেখানে ঠোঁটের ভাষা স্তব্ধ হয়ে যায়,
আর রূহ নিজের ভাষায় কাঁদতে শুরু করে।
সেই কান্না শব্দহীন, অথচ বজ্রের চেয়েও প্রবল;
অদৃশ্য, অথচ আরশের দরবার পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
সেই রাতে আমি কোনো ভাষায় দোয়া করিনি।
কোনো শব্দ সাজাইনি, কোনো বাক্য গড়িনি।
আমি শুধু আমার ভাঙা অস্তিত্বটুকু,
আমার অপূর্ণতা, আমার অহংকার,
আমার গোপন ব্যথা, আমার অদৃশ্য ক্ষত—
সবকিছু তোমার রহমতের দরজায় রেখে দিয়েছিলাম।
আর দেখলাম———
যে অহংকার পাহাড়ের মতো কঠিন মনে হতো,
এক ফোঁটা অশ্রুর উষ্ণতায় গলে যেতে শুরু করেছে।
সেই রাতে আমি উপলব্ধি করলাম—
খালওয়া মানে কেবল মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়;
খালওয়া হলো নিজের নফস থেকে দূরে সরে যাওয়া।
নিজের “আমি”-কে পিছনে ফেলে,
নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্র থেকে অহংকারকে সরিয়ে,
আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার নামই খালওয়া।
যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে,
যখন দুনিয়ার বাজার স্তব্ধ হয়ে যায়,
যখন মানুষ তার স্বপ্নের ভেতরে হারিয়ে যায়—
তখন কিছু রূহ জেগে ওঠে তোমার নূরের সন্ধানে।
সেই রাতের নীরবতায়
আমার দীর্ঘশ্বাস জিকির হয়ে যাচ্ছিল,
আমার অশ্রু মুনাজাতে রূপ নিচ্ছিল,
আর আমার হৃদয়ের প্রতিটি ভাঙন
তোমার রহমতের দিকে একটি করে দরজা খুলে দিচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল—
নীরবতা শুধু নীরবতা নয়;
এ যেন এমন এক ভাষা,
যা ফেরেশতারাও শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনে।
আজ আমি সত্যিই বুঝেছি—
কান্না কোনো দুর্বলতা নয়।
তোমার জন্য কাঁদতে পারা,
তোমার বিচ্ছেদের বেদনায় হৃদয় গলে যাওয়া,
তোমার নৈকট্যের জন্য রাত্রির অন্ধকারে ব্যাকুল হওয়া—
এ পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল এবং সবচেয়ে মহামূল্যবান নেয়ামতগুলোর একটি।
এই পৃথিবী মানুষের চোখ শুকিয়ে দেয়,
হৃদয়কে কঠিন করে দেয়,
আত্মাকে ব্যস্ততার কারাগারে বন্দি করে রাখে।
কিন্তু তুমি যাকে ভালোবাসো,
তার অন্তরে অশ্রুর একটি গোপন ঝর্ণা প্রবাহিত করে দাও;
যাতে সে মানুষের জন্য নয়,
তোমার জন্য কাঁদতে শেখে।
তাহাজ্জুদের নিস্তব্ধ অন্ধকারে
একজন বান্দার চাপা কান্না—
হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র কবিতা,
সবচেয়ে বিশুদ্ধ জিকির,
সবচেয়ে সত্য দোয়া।
আজও সেই খালওয়ার গভীরে
আমি আমার হারিয়ে যাওয়া রূহকে খুঁজে ফিরি।
মানুষের ভিড়ে যে হৃদয় একদিন পাথর হয়ে গিয়েছিল,
তোমার নীরব রহমতের স্পর্শে
সেই হৃদয় আবার নরম হতে শিখছে।
এখন আর কিছু চাই না।
হে আমার রব,
আমাকে এমন অশ্রু দাও—
যে অশ্রু মানুষের প্রশংসা খোঁজে না,
শুধু তোমার সন্তুষ্টির পথ খোঁজে।
আমাকে এমন খালওয়া দাও—
যেখানে দুনিয়ার সমস্ত শব্দ নিভে যায়,
আর শুধু তোমার নূরের উপস্থিতি জেগে থাকে।
আমাকে এমন হৃদয় দাও—
যে হৃদয় হাজারবার ভেঙে গেলেও,
হাজার ঝড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও,
তোমার দরজা ছাড়া আর কোনো দরজায় মাথা নত না করে।
আর আমাকে এমন রূহ দাও—
যে রূহ দুনিয়ার সব পথ পেরিয়ে
শেষ পর্যন্ত শুধু তোমার দিকেই ফিরে আসে।
কারণ শেষ আশ্রয় তুমি,
শেষ প্রেম তুমি,
শেষ নীরবতা তুমি,
আর শেষ প্রত্যাবর্তনও তোমার দিকেই;
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন”।

Copyright ©️International Author/Sufi Poet 
Sayeeda Sharmin, Canada 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url