আবু রাইহান-এর একগুচ্ছ কবিতা
নিয়নের আলোয় গলে যাওয়া মানুষ ও মানুষীরা
আবু রাইহান
রাত্রি নামে ধীরে-জলের মতো,শব্দহীন,
ধূসর নীল ও বেগুনি মেঘে ঢেকে যায় আমাদের পরিচয়,
নিয়নের আলোয় গলে যায় মানুষ ও মানুষীরা-
আর নিজেদের শরীর ভাসে অদ্ভুত জ্যোৎস্নার অস্থিরতায়।
এই সব রাত জাদু জানে,একবার আলিঙ্গনেই
জেগে ওঠে আনখশির আদিম বন্যতা।
আমরা কাঁপতে থাকি,নিবিড়, থরথর,
ভালোবাসার নয়-ভয় আর বিস্ময়ে,
যেন কিছু হারানোর আগে শেষ স্পর্শ পেতে চাই।
এ রাত যদি শেষ না হতো,যদি চলতো এই আলো-ছায়ার ঢেউ
তবে আরেকবার নিবিড় আলিঙ্গনে চুমু খেতাম ভোর হবার আগেই।
ঘ্রাণ ও গোপন অভিজ্ঞান
আবু রাইহান
আমিও রেখেছি কিছু ঘ্রাণমাখা উপাখ্যান,
পালকের নিচে,কবুতরের ডাকের ভেতরে,
ভুলে যাওয়া পুরাতন পত্রিকার অভ্যন্তরে-
যেখানে সঞ্চিত আছে অক্ষরের গোপন দহন।
সুচরিতা আজও গোপনে রাখে ডায়েরির পাতা,
তার বুকের কুন্ডলিতে বাঁধা অতীতের মানচিত্র-
সেখানে নদীর আঁচলে লেখা-শুধু ভালোবাসার ভাষা।
আমি বুঝি সেই ভাষা-
যখন প্রথম বর্ষণে ভিজে যায়
ঋতুবতী মেয়ের শাড়ির ভাঁজ,
অজানা শিহরণে দুলে ওঠে হ্যারিকেনের আলো,
অন্ধকারের গায়ে জোনাকির মতো রোমাঞ্চ এসে বসে।
দেবদারুর ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমি শুনি-
কীভাবে নিঃশব্দে নির্জন দুপুর গলে পড়ে,
একটা হাঁসফাঁস করা প্রেমের কবিতায়।
কালো চিল উড়ে যায় আকাশের রেখা ধরে,
আর আমি বুঝে ফেলি-ভালোবাসা আসলে একটা ঘ্রাণ,
যা সুচরিতার ডায়েরির পাতায় লেখা নেই,
কিন্তু বাতাসে থাকে,এলাচের মতো নীরব অথচ অমোঘ।
শূন্য আকাশের নীলে উজ্জ্বল সন্ধ্যা তারা
আবু রাইহান
কার্তিকের বেলা শেষের রোদে ধানের গন্ধ ভাসে দূরের মাঠে
বটের ছায়ায় নিঃশব্দে বয়ে যায় অলস বিকেলের ক্লান্ত বাতাস
কুয়াশার নরম চাদরে জড়িয়ে আছে আজন্মের পরিচিত পথঘাট
জলচর পাখির ডানায় যেন সোনালি নদীর মায়াবী দীর্ঘশ্বাস।
আমি নিঃসঙ্গ মাঠের পাশে একাকী বসে শুনি প্ৰিয় মাটির ভাষা
শুকনো পাতা ঝরার শব্দে ফিরে আসে হারানো স্মৃতির মায়া
শূন্য আকাশের নীল গভীরে ধীরে জ্বলে ওঠে উজ্জ্বল সন্ধ্যা তারা
আর ধোঁয়াশায় ঢাকা গ্রামগুলিতে কেবল শীতার্ত রাত্রির ছায়া।
হিজলের ছায়া পেরিয়ে চাঁদ নেমে আসে নিঃসাড় পুকুরের জলে
জলরেখায় কেঁপে ওঠে তোমার মলিন হয়ে যাওয়া মায়াবী মুখ
চিরচেনা এই ঘাস,এই সোঁদা ধুলো,এই নির্জন কার্তিকের আলো
আমার সমস্ত ক্লান্ত প্রাণে রেখে যায় বিশুদ্ধ ভালোলাগার সুখ।
এক অপূর্ব সম্মোহনে মৃত্যুর মাঝখানে জীবন হেঁটে যায়
আবু রাইহান
একদিকে মায়াময় স্বজনের প্রিয় কলরব,
চেনা হাসির মধ্যে অনুরণিত শৈশবের গান।
অন্যদিকে এক প্রগাঢ় নীরবতা-
আত্মজনের চিরনিদ্রার অনন্ত আবাস।
সৌভাগ্য রাজনীতেও কেউ কাউকে ছুঁতে পারি না,
শুধু অনুভব করি দূর থেকে নিঃশব্দে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের সুতো।
কেঁপে ওঠে অনুভবের পৃথিবী,টলমল করে জীবনের নৌকো,
চাই চোখ ফেরাতে অন্ধকারময় তীর থেকে,
যেখানে কেবল শোকের ছায়া।
আলো ঝলমল পৃথিবীর দিকে ফিরি-
হয়তো একটুখানি উষ্ণতা বাঁচিয়ে রাখে মানুষ।
আর তুমি-তুমি সেই অলৌকিক,জোনাকির ভাষায় কথা বলা সত্ত্বা,
কবর খোঁড়ার গান গাইতে গাইতে
রহস্যময় হাতে খুঁড়ে যাচ্ছ আমার কবর-
তবুও সে খননে মৃত্যু নেই,আছে এক নবজন্মের সম্ভাবনা।
আমি চমকে দেখি-আঁধারের পাশেই হেসে ওঠে চাঁদ,
জ্যোৎস্না আর মৃত্যুর মাঝখানে জীবন হেঁটে যায়,
এক অপূর্ব সম্মোহনে,আলোর দিকে, চিরউদ্ভাসিত।
ফিরে আসি বিষাদের ভেতর দিয়েই
আবু রাইহান
জানি-সবকিছুই মিথ্যে হয়ে যাবে একদিন,
ভালোবাসার স্পর্শও রয়ে যাবে বাতাসে,
অনিবার্য মৃত্যুতে-শোক হবে একটি নিঃশব্দ বিকেল,
যেখানে তোমার নাম কেউ আর উচ্চারণ করবে না।
তবু আমি হাঁটি,চেনা মৃত্যুর ছায়ার মধ্য দিয়ে,
হাঁটি বিষণ্ন নদীর পাড় ধরে,
একথা জেনেই যে কিছুই চিরস্থায়ী নয়।
আমার পায়ে লেগে থাকে ছিন্ন পত্র,
চোখের কোনে জমে ওঠে অতীতের বিষাদমাখা ধুলো,
তবুও আমি ফিরে আসি নবজন্মের কোনো অদৃশ্য ঘ্রাণে,
অথবা এক অচেনা আলোয়,যার কোনো উৎস নেই।
প্রতিবারই আমি যখন এক শূন্যতাকে স্পর্শ করি-
মৃত্যু থেকে উঠে এসে
আবারও বিষাদের বুকেই বপন করি
নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন সম্ভাবনা।
লেখক পরিচিতি:
লেখক আবু রাইহান-এর জন্ম পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামের সরবেড়িয়া গ্রামে ১৯৭০ সালে। বর্তমানে কর্মসূত্রে বন্দর শিল্পনগরী হলদিয়ার বাসিন্দা। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় এম এসসি এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি থেকে বায়ো-টেকনোলজিতে এম.টেক।পেশায় হলদিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি ডিগ্রী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বায়ো-টেকনোলজি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র ‘দিনদর্পণ’ পত্রিকার অ্যাসোসিয়েট এডিটর(সাহিত্য সম্পাদক)।‘সাহিত্যের প্রমিতকথন’ ই-ম্যাগের সম্পাদক।নব্বইয়ের দশকের বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, কবি, সাংবাদিক, নিবন্ধ ও গল্প লেখক। ‘সাহিত্যের প্রমিতকথন’ ই-ম্যাগের সম্পাদক।এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ-‘বাংলা কাব্য সাহিত্যে ইসলামী সমাজ ও সংস্কৃতি’, ‘বাংলাদেশের আলোকিত মুসলিম মানস’,‘স্বপ্নের কবি আল মাহমুদ’,‘ভারত উপমহাদেশের ‘আজাদী’র লড়াই উপেক্ষিত ইতিহাস’,‘ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরম্পরা’, 'উত্তরাধুনিক বাংলা উপন্যাস কালের মহাকাব্যিক আখ্যান’, ‘দেশভাগ মুসলিম সমাজ ও বাংলা সাহিত্য’, ‘মহৎ কবি নজরুল চিরকালীন’, ‘আধুনিক বিশ্বের আলোকিত মুসলিম’, ‘বাংলা কবিতার মায়াবী ভুবন জীবনানন্দ দাশ থেকে জয়নাল আবেদিন’,‘হে প্রিয় জীবনানন্দ’, 'স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক মুসলিম কবি ও সাহিত্যিক',‘সাহাবী কবিদের জীবন ও কবিতা’, ‘প্রথম মুসলিম শাসক বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয় শাহী বাংলায় সাহিত্যের স্বর্ণযুগ’. ‘গুড মুসলিম ব্যাড মুসলিম’(অনুবাদ গ্রন্থ),‘আধুনিক আরবি ছোট গল্প’(অনুবাদ গ্রন্থ),‘আধুনিক আরবী কবিতা’(অনুবাদ গ্রন্থ), ‘মধ্যযুগীয় ভারতে মন্দির ধ্বংস ও মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ’ (অনুবাদ গ্রন্থ), 'ভারতের ইসলামি ঐতিহ্য’ (অনুবাদ গ্রন্থ), ‘মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গোহী জীবন ও কীর্তি’ (অনুবাদ গ্রন্থ),‘ইতিহাসের সত্যানুসন্ধানী এম আবদুর রহমান’(জীবনীগ্রন্থ),‘নির্বাচিত কবিতা আবদুর শুকুর খান’(সম্পাদিত গ্রন্থ)।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘নিষিক্ত ভালোবাসা’, ‘সংকেতময় বিস্ময়’,‘ভালোবাসার খোয়াবনামা’, ‘নদীর কাছে জলজ ছায়া’ ‘ভালোবাসা লিখি রাত্রির খামে’,‘নক্ষত্রের তন্দ্রাচ্ছন্ন শামিয়ানা’, 'প্রগাঢ় শূন্যতা নিজস্ব অন্ধকার’, ‘অপার্থিব আলোর বিষন্ন বৈরাগী’,‘ঈশ্বরের মুখ জ্বলে জলের অবিনশ্বর বিভায়’ এবংমহিমান্বিত রাতের অলৌকিক সৌরভ।লেখালেখির জন্য পেয়েছেন দুই বাংলায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সাহিত্য সম্মাননা ও পুরস্কার।হলদিয়া পৌরসভার সেরা সাংবাদিক পুরস্কার ২০০৬, ‘নিষিক্ত ভালোবাসা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘কুসুমের ফেরা’ সাহিত্য পত্রিকার ‘কবি জসীমউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার-২০১৫’,‘টার্মিনাস’ সাহিত্য পত্রিকা পুরস্কার-২০১৭,‘বঙ্গপ্রদেশ’ পত্রিকার ‘বঙ্গরত্ন সাহিত্য পুরস্কার-২০১৮, 'বাংলাদেশে ‘কবি সাযযাদ কাদির স্মৃতি সম্মাননা-২০২০’,বাংলাদেশের ‘রবীন্দ্র-নজরুল ফাউন্ডেশন’ এর ‘সংহতি সম্মাননা-২০২০’,বাংলাদেশ টাঙ্গাইল কবিতা উৎসবে ‘মুজিববর্ষ স্মারক সম্মাননা-২০২০’, আলোপথ পত্রিকা ও পাবলিক নিউজ ভয়েস সম্মাননা -২০২০,NRB News 24.Com সম্মাননা ২০২১, সংলাপ সাহিত্য পুরস্কার-২০২১,‘কবি বিনোদ বেরা স্মৃতি সম্মাননা-২০২২’ সালাম বাংলা সাহিত্য পুরস্কার-২০২২ এবং কবি মোহাম্মদ রাফিকুর রহমান স্মৃতি সম্মানননা ২০২৩,কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি সম্মাননা ২০২৩,সৈকত সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪,প্রান্তদেশ সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫, দিনকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫,বনানী সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫, জলধ্বনি সাহিত্য সম্মাননা ২০২৫,২৩ জানুয়ারি নেতাজি জন্মজয়ন্তীতে হলদিয়া পুলিশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক সম্মাননা ২০২৬ ইত্যাদি।
Mobile-8900366445(whatsaap)
Mail-raihan.abu@gmail.com/aburaihan.dindarpan2017@gmail.com
