ড.সাবিনা ইয়াসমিন - এর একগুচ্ছ কবিতা
পৃথিবী
ড. সাবিনা ইয়াসমিন

এই যে পৃথিবী— কেবল মাটি নয়, কেবল জল নয়, এ এক আয়াত, নীরব আলোকলিপি, যেখানে প্রতিটি ধূলিকণাও উচ্চারণ করে— “কুন ফায়াকূন।”
নক্ষত্রেরা এখানে ঘুমায় না, তারা জেগে থাকে মানুষের স্বপ্ন পাহারা দিতে; গ্যালাক্সিরা ঘুরে ঘুরে লিখে যায় ভাগ্য, আর আকাশ—এক খোলা কুরআন, যেখানে রাত মানে তিলাওয়াত, দিন মানে তাফসীর।
পাহাড়েরা দাঁড়িয়ে থাকে নীরব নবীর মতো, তাদের বুকে জমে থাকে সময়ের সিজদা; বাতাস এসে পড়ে তাদের কাঁধে— মনে হয় ইতিহাসের ক্লান্তহীন ফেরেশতা।
এই পৃথিবী ছেড়ে কেউ যেতে চায় না— কারণ এখানে আছে মায়ের কোল, প্রথম প্রেমের অনুচ্চারিত কম্পন, একটি শিশুর প্রথম হাসি, আর শেষ বিদায়ের নিঃশব্দ কান্না।
এখানে গল্প আছে— জীবন নিজেই যার চিত্রনাট্য লেখে; এখানে সুর আছে— হৃদয় নিজেই যার সংগীত হয়ে ওঠে।
মনে রেখো—
“পৃথিবী কখনো নিঃস্ব নয়, মানুষই তার চোখ বন্ধ করে রাখে।”
মনে রেখো—
“যে হৃদয় ভালোবাসতে শেখে, সে-ই পুরো পৃথিবীকে নিজের করে নেয়।”
মনে রেখো—
“সময় চলে যায়, পৃথিবী থেকে যায়— কিন্তু মানুষের কাজই তার পরিচয় হয়ে বেঁচে থাকে।”
পৃথিবীর মূলনীতি খুব সহজ— ভালোবাসা বপন করো, শান্তি ঘরে তোলো; অন্যের অশ্রু মুছিয়ে দিলে নিজের আকাশে নেমে আসে নতুন নক্ষত্র।
সাহিত্য এখানে নদীর মতো— শব্দেরা বয়ে চলে সুরের ভেলায়, আর প্রতিটি কবিতা— একটি আত্মার সফর, এক অনন্ত যাত্রা।
এই পৃথিবী— একটি সুরেলা নামাজ, যেখানে প্রতিটি প্রাণী একেকজন ইমাম, আর প্রতিটি হৃদয় একেকটি মসজিদ।
তুমি যদি শোনো, পৃথিবী প্রতিদিন বলে—
“আমি তোমাদের জন্য সৃষ্টি, তোমরা কি একে জানার জন্য বেঁচে আছো?”
শেষে বলি— পৃথিবী কোনো স্থান নয়, এ এক অনুভব, এক আমানত, এক পরীক্ষা; যে একে বুঝতে পারে, সে-ই সত্যিকারের মানুষ।
শেষে মনে রেখো—
“পৃথিবী একটি প্রশ্ন, আর মানুষ তার উত্তর হয়ে ওঠার যাত্রা।”
আর যারা ভালোবাসতে শেখে— তাদের নামই লেখা থাকে সময়, ইতিহাস, আর অনন্তের পাতায়।
ইতিহাসের নির্মাতা
ড. সাবিনা ইয়াসমিন

শব্দের মেলায় অনেক কণ্ঠ—লম্বা তাদের ছায়া, ভিতর শূন্যের প্রতিধ্বনি; নিস্তব্ধতার গর্ভে যে আগুন জন্ম নেয়, তার পদচিহ্নে সময় নিজেকে অনুবাদ করে।
শব্দে নয়, কর্মে যার শক্তি প্রকাশ পায়,
সেই মানুষই একদিন ইতিহাস গড়ে যায়।
সে কম বলে—কাজেই রেখে যায় উচ্চারণ; ঘামের অক্ষরে ভোরের মানচিত্র আঁকে, শূন্য হাতেই তোলে আকাশের সিঁড়ি, মাটির গভীরে রোপণ করে সম্ভাবনা।
দেখেছ কখনো—এক ফোঁটা রক্তে সূর্যের আভাস? নীরব এক শপথে যুগের গতি? অদৃশ্যের ভেতরেই দৃশ্যের জন্ম, শূন্যতার গর্ভেই বিস্তার পায় প্রাণ।
শূন্য হাতে যারা স্বপ্ন ছোঁয়, সময় তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে; নীরব আগুনে যারা নিজেকে জ্বালায়, তাদের ছাই থেকে জেগে ওঠে আগামী।
কাঁটার পথ—তবু থামে না; ঝড় পেরিয়ে, নিজের ভেতরেই সংঘর্ষ; অন্ধকারে জ্বালায় এক বিন্দু দীপ— তাতেই খুলে যায় অগণিত আলোর দুয়ার।
কেউ দেখে না তার রাত, কেউ শোনে না প্রতিজ্ঞার নিচু স্বর; তবু সে এগোয় কর্মের দিকে, যেখানে বাকিটা কুয়াশা হয়ে মুছে যায়।
ইতিহাস কালি চেনে না—চেনে ঘাম, রক্ত, স্থির ইচ্ছা; যে নিজের অন্ধকার অতিক্রম করে, আলো নিজেই তাকে চিনে নেয়।
শেষে, সময়ের দরজায় নীরবতা দাঁড়ায়—কথা মুছে যায়, থেকে যায় শুধু কর্মের দীপ্তি; তখন মহাকালের অন্তঃসুরে উচ্চারিত হয় এক নাম—ইতিহাসের নির্মাতা।
এক ওংকারের আলোকধ্বনি
ড. সাবিনা ইয়াসমিন

প্রথমে ছিল না নাম, না রূপ, না বিভাজনের রেখা— ছিল শুধু এক অনন্ত স্পন্দন, শূন্যের পূর্ণতা। সেই এক সুরের নামই যেন “এক ওংকার”— একই শ্বাসে সৃষ্টির আরম্ভ, একই শ্বাসে অসীমের বিস্তার।
মানুষ এসেছে সহস্র পরিচয় বুকে নিয়ে, তবু আকাশ জিজ্ঞেস করে না— “তুমি কোন বিশ্বাসের সন্তান?”
সূর্যও আলো বিলানোর আগে কোনো নামের তালিকা খোঁজে না; তার দান নির্বিচার, তার উষ্ণতা সবার জন্য।
শিখ গুরুদের বাণী বলে— মানুষ হও, তারপর পরিচয়ের জন্ম; এই সত্য বিভেদের দেয়াল ভেঙে মানবতার সমুদ্রে মিশে যায়।
সেবা কোনো শব্দ নয়— এ এক চলমান জ্যোতি; যেখানে হাত হয়ে ওঠে প্রার্থনার ভাষা, আর হৃদয়—এক অন্তহীন দরবার; যেখানে অহংকার নত হয়, সেখানেই ঈশ্বরের আলো জ্বলে ওঠে।
তুমি কি শুনতে পাও নিঃশব্দ এক কীর্তনের ধ্বনি?
না কোনো মন্দিরে, না কোনো মসজিদে— বরং অন্তরের নির্জন আকাশে;
সেখানে শব্দ জন্ম নেয় না, তবু অর্থ জেগে থাকে; বিশ্বাসের সীমানা নেই— আছে শুধু উপলব্ধির দীপ্তি।
“যে নিজেকে জয় করে, সে-ই মহাবিশ্বের দ্বার উন্মুক্ত করে।”
যে নিজেকে জানে, সে-ই সত্যের পথে হাঁটে; যে অন্যকে জাগায়, সে-ই আলোকে বাড়ায়।
সময় ভেঙে দেয় সাম্রাজ্য, ইতিহাস মুছে ফেলে রাজাদের নাম— তবু সত্য নিভে না; কারণ তা চেতনার গভীরে রোপিত, আলো পেলে যুগে যুগে ফুল হয়ে ফেরে।
যখন তুমি অন্যকে উত্তোলন করো, তখনই নিজের উচ্চতার সীমা অতিক্রম করো; মানবতার সেবা আত্মারই প্রসার— অন্যের মুখে হাসি ফোটানো নিজের অন্তরে আলো জ্বালানো।
©® Dr. Sabina Yeasmin
