অনুগল্প - আমি পুনম, কলমে - সালেক উদ্দিন

 

সালেক উদ্দিন - এর ফটো










আমি পুনম
সালেক উদ্দিন



—আগামী ২৬ জুলাই তোমার পঁচিশতম জন্মদিন।
—জানি, ড্যাড।
—সিলভার জুবলী।
—তাই!
—এবার জন্মদিনটা অন্যভাবে উদ্‌যাপন করতে চাই।
—কীভাবে?
—তোমার পাঁচজন ছেলে বন্ধুকে ডাকবে।
—পাঁচজন?
—যারা এখনো টিকে আছে।
—তুমি আমার বন্ধুদের হিসাব রাখো?
—বাবারা অনেক কিছু জানে। শুধু মেয়েরা কী চায়, সেটা বুঝতে পারে না।
—তাহলে তুমি কী জানতে চাও?
—তুমি কাকে চাও।
—আমি কাউকে চাই না।
—তাহলে সবাই তোমাকে কেন চায়?
—তুমি কি সত্যিই মনে করো, তারা আমাকে চায়?
—তুমি কী মনে করো?
—তারা আমার ড্যাডকে চায়।
—তবু ২৬ জুলাই তাদের আসতে বলবে।
—এতে কী প্রমাণ হবে?
—কেউ তোমাকে দেখছে, নাকি তোমার পেছনে দাঁড়ানো মানুষটাকে—সেটা বুঝবে।
—আর যদি কেউ বলে সে আমাকে ভালোবাসে?
—জিজ্ঞেস করবে, “আমাকে, নাকি আমার বাবার মেয়েকে?”
—ড্যাড, তুমি আজ খুব নিষ্ঠুর।
—জীবন কখনো কখনো বাবার চেয়েও নিষ্ঠুর হয়।

—হ্যালো, রিফাত?
—হ্যাঁ, পুনম।
—তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো?
—এই প্রশ্নের উত্তর তোমার সামনে বসে দিতে চাই।
—২৬ জুলাই এসো।
—অবশ্যই।
—একটা শর্ত আছে।
—যে কোনো শর্ত।
—সবার সামনে বলবে, তুমি আমাকে কী হিসেবে দেখো।
—আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
—কেন?
—কারণ তুমি পুনম।
—আর?
—তোমার বাবা...
—থামো।
—কী হলো?
—কিছু না। তোমার উত্তরটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল।

—হ্যালো, ববি?
—আমার বিয়ে?
—তা হলে আমার সাথে এত দিন যে ডেট করলে?
—শুধু তোমার সাথে নয়, আরো কারো কারো সাথে। আমাদের সোসাইটিতে এটা বড় বিষয় নয়।
—কাকে বিয়ে করছো?
—এখনো ঠিক করা হয়নি।
—কবে ঠিক হবে?
—২৬ জুলাই।
—পরীক্ষা হবে?
—হ্যাঁ, ভালোবাসার পরীক্ষা।
—আমি তোমাকে ভালোবাসি।
—আমার বাবা যদি সাধারণ একজন মানুষ হতেন?
—তবুও।
—আমার কোনো টাকা না থাকত?
—তবুও।
—আমি যদি আরও উশৃঙ্খল হতাম?
—তবুও।
—তাহলে ২৬ জুলাই এসো।
—কী হবে?
—তোমার কথাগুলো সবার সামনে বলবে।
—বলব।
—মিথ্যা বলবে না।
—মানুষ নিজের সুবিধার জায়গায় দাঁড়িয়ে যে কথাটা বলে, তাকে মিথ্যা মনে করে না।

—ড্যাড।
—হ্যাঁ?
—একজনও আসছে না।
—তুমি কি তাদের আসতে নিষেধ করেছ?
—হ্যাঁ।
—কেন?
—কারণ তাদের চোখে নিজেকে দেখে ফেলেছি।
—কী দেখেছ?
—তোমার মেয়ে।
—তুমি কী খুঁজছ?
—একজন মানুষ।
—কেমন?
—যে আমার বাবার নাম না জেনেও আমাকে চিনবে।
—তোমার অতীত জানতে চাইলে?
—থামব।
—কেন?
—কারণ আমার অতীত শুনেও যে থাকবে, সে অন্তত আমাকে মানুষ হিসেবে দেখেছে।

—হ্যালো, পুনম।
—কে?
—তোমার বিবেক।
—এতদিন কোথায় ছিলে?
—তোমার চারপাশের শব্দের নিচে।
—একটা গল্প বলবে?
—একটা মেয়ে ছিল। নাম পিয়া।
—তার বাবা খুব ধনী?
—হ্যাঁ।
—পিয়াকে সবাই ভালোবাসত?
—সবাই বলত।
—তারপর?
—একদিন পিয়া একজনকে বলল, “কাল থেকে আমার বাবার নাম কেউ জানবে না।”
—ছেলেটা কী বলল?
—“তাহলে তোমাকে খুঁজব কীভাবে?”
—পিয়া কী বলল?
—“আমার নাম দিয়ে।”
—তারপর?
—পরদিন ছেলেটা আর আসেনি।
—পিয়া কী করেছিল?
—নিজের ভেতরের একটা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
—তারপর?
—একদিন দরজাটা খুলেছিল।
—কী পেল?
—নিজেকে।
—গল্পটা কার?
—যার নাম তুমি এখনো অন্যের মুখে শুনতে অভ্যস্ত।

—ড্যাড।
—হ্যাঁ?
—আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকতে চাই না।
—তুমি আমার মেয়ে।
—এটা আমার সম্পর্ক, পরিচয় নয়।
—তাহলে তোমার পরিচয়?
—সেটা আমি নিজেই বানাব।
—কী নাম দিয়ে?
—পুনম।
—বারোটা বাজতে আর এক মিনিট।
—কেক কাটবে?
—হ্যাঁ।
—কেউ আসেনি।
—না।
—খারাপ লাগছে?
—না।
—একটুও?
—আজ একটা ঘর খালি হয়েছে।
—কোন ঘর?
—যেখানে সবাই আমাকে তোমার মেয়ে বলে চিনত।
—এখন?
—সেখানে আমি থাকব।
—আর যদি কেউ না আসে?
—দরজা খোলা থাকবে।
—কার জন্য?
—যে নাম না জেনেও আমাকে চিনবে।
—আর যদি সে আসে?
—তাকে একটা প্রশ্ন করব।
—কী?
—“তুমি আমাকে চাও, নাকি আমার বাবার ছায়াকে?”
—আর তোমার উত্তর?
—আমার উত্তর আজ হয়ে গেছে।
—কী উত্তর?
—আমি আর কারও মেয়ে হয়ে ভালোবাসা কিনব না।
—তোমার নাম কী?
—...
—পুনম?
—আমি পুনম।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url