মোসাহেবতন্ত্র: মেরুদণ্ড যখন ছুটিতে যায় কলমে - ড. আবু তাহির ও এমএসটি আঞ্জুমান সুলতানা
মোসাহেবতন্ত্র: মেরুদণ্ড যখন ছুটিতে যায়
কলমে -
১. ড. আবু তাহির
প্রিন্সিপাল, ইস্ট মালদা বিএড কলেজ, মালদা।
২. এমএসটি আঞ্জুমান সুলতানা
রিসার্চ স্কলার, অরুণোদয় ইউনিভার্সিটি, ইটানগর, লেখি, অরুনাচল প্রদেশ।
রাজা বদলায়, রাজত্ব বদলায়,
সিংহাসনের রং বদলায়—
শুধু মোসাহেব বদলায় না।
সে অমর।
ইতিহাসের প্রতিটি যুগে
সে নতুন জামা পরে ফিরে আসে।
আগে তার হাতে থাকত পাখা,
এখন থাকে স্মার্টফোন।
আগে সে বলত—
“জয় হোক মহারাজের!”
এখন বলে—
“স্যার, আপনার মতো ভিশনারি মানুষ
আমি জীবনে দেখিনি!”
মহারাজ যদি বলেন—
“সূর্য আজ পশ্চিমে উঠেছে,”
মোসাহেব চশমাটা একটু ঠিক করে বলে—
“স্যার, এটাই তো আপনার দূরদৃষ্টি!
সাধারণ মানুষ পূর্ব দিকটাই দেখে,
আপনি দেখেন সম্ভাবনার দিক!”
মহারাজ যদি পরের দিন বলেন—
“না না, সূর্য তো পূর্বেই ওঠে!”
মোসাহেব সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে—
“একদম ঠিক, স্যার!
কাল আপনি আসলে আমাদের পরীক্ষা করছিলেন।
আমি তখনই বুঝেছিলাম—
কিন্তু আপনার আগে বলে
আপনাকে ছোট করতে চাইনি!”
আহা, কী বিনয়!
কী আনুগত্য!
কী আশ্চর্য মেরুদণ্ড—
প্রয়োজনে সামনে বাঁকে,
প্রয়োজনে পিছনে বাঁকে,
আর সুযোগ দেখলে
পুরোটাই পকেটে ঢুকে যায়!
একদিন মহারাজ সভায় এসে বললেন—
“আমার মনে হচ্ছে,
আমি আজকাল খুব ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”
মোসাহেব লাফিয়ে উঠে বলল—
“অসম্ভব, স্যার!
আপনার ভুল সিদ্ধান্তও
অন্য মানুষের সঠিক সিদ্ধান্তের চেয়ে উন্নত!”
রাজা অবাক—
“ভুল আবার উন্নত হয় কী করে?”
মোসাহেব মুচকি হেসে বলল—
“স্যার, এটাই আপনার বিশেষত্ব।
আপনি এমনভাবে ভুল করেন
যে ভুলটাও আপনার কাছে এসে
নিজেকে সঠিক মনে করতে শুরু করে!”
সভায় হাততালি পড়ল।
কে যেন পিছন থেকে ফিসফিস করে বলল—
“লোকটা সাংঘাতিক!”
মোসাহেব শুনে ফেলল।
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বলল—
“সাংঘাতিক নই ভাই,
আমি বাস্তববাদী!”
বাস্তববাদ মানে কী?
যে চেয়ারে ক্ষমতা,
সেই চেয়ারেই সত্য।
আজ চেয়ার ডানে গেলে
সত্য ডানে।
কাল চেয়ার বাঁয়ে গেলে
সত্যও বাঁয়ে।
আর চেয়ার যদি মাঝখানে থাকে—
মোসাহেব বলে,
“আমি বরাবরই মধ্যপন্থী ছিলাম!”
তার রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই,
নৈতিক দর্শন নেই,
স্থায়ী অবস্থান নেই—
তার আছে শুধু
একটি অত্যন্ত উন্নতমানের
চেয়ার-সনাক্তকরণ যন্ত্র।
দূর থেকে সে বুঝতে পারে—
কোন চেয়ারে ক্ষমতা আছে,
কোন চেয়ারে ভবিষ্যৎ আছে,
আর কোন চেয়ারের পাশে দাঁড়ালে
নিজের জন্য আরেকটা চেয়ার পাওয়া যেতে পারে!
মোসাহেব খুব শিক্ষিতও হতে পারে।
তার নামের আগে
ডক্টর, প্রফেসর, সাহিত্যরত্ন, সমাজরত্ন,
জ্ঞানরত্ন, বিদ্যারত্ন—
রত্নের অভাব নেই।
শুধু একটা জিনিসের অভাব—
মেরুদণ্ডরত্ন!
সে সভায় নীতির কথা বলে,
সেমিনারে সত্যের কথা বলে,
ফেসবুকে বিবেকের কথা লেখে,
আর ক্ষমতাবানের ঘরে ঢুকেই বলে—
“স্যার, আপনার কথাই শেষ কথা।”
বাইরে বেরিয়ে বন্ধু জিজ্ঞেস করে—
“তুমি তো একটু আগে উল্টো কথা বলছিলে?”
সে গম্ভীর হয়ে বলে—
“ওটা ছিল আমার ব্যক্তিগত মত।”
—“আর এখন?”
—“এটা আমার পেশাগত মত।”
—“তাহলে আসল মত কোনটা?”
মোসাহেব একটু ভেবে বলে—
“যেটাতে লাভ বেশি,
সেটাই আপাতত আসল!”
একদিন রাজা পরীক্ষা করার জন্য বললেন—
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি,
রাজ্যের সব গাধাকে ঘোড়া ঘোষণা করব।”
মোসাহেব বলল—
“ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, মহারাজ!”
মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন—
“কিন্তু গাধা কি ঘোষণায় ঘোড়া হয়ে যায়?”
মোসাহেব হেসে বলল—
“আপনি প্রশাসন বোঝেন না।
আগে বিজ্ঞপ্তি বের হোক,
তারপর দেখবেন সবাই ঘোড়াই বলবে!”
রাজা মজা পেয়ে বললেন—
“আর যদি কাল বিজ্ঞপ্তি বাতিল করি?”
মোসাহেব বলল—
“তাহলে প্রমাণ হবে, মহারাজ,
আপনি গাধা আর ঘোড়ার পার্থক্য
অসাধারণ দ্রুত বুঝতে পারেন!”
রাজা মাথায় হাত দিলেন।
কিন্তু মোসাহেব থামল না—
“মহারাজ, মাথায় হাত দেওয়ার ভঙ্গিটাও
আপনার অসাধারণ!
এত রাজকীয় হতাশা
আমি জীবনে দেখিনি!”
রাজা চিৎকার করে বললেন—
“চুপ করো!”
মোসাহেব বলল—
“বাহ্! কী সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষণ!”
রাজা বললেন—
“বেরিয়ে যাও!”
মোসাহেব দরজার দিকে যেতে যেতে বলল—
“অসাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত!”
রাজা আবার ডাকলেন—
“ফিরে এসো!”
সে দৌড়ে এসে বলল—
“আমি জানতাম, মহারাজ!
আপনার হৃদয়টা খুব বড়!”
রাজা এবার হতাশ হয়ে বললেন—
“তোমার কি নিজের কোনো মত নেই?”
মোসাহেব একটু চিন্তা করল।
তারপর খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল—
“আছে মহারাজ, অবশ্যই আছে।
তবে আপনার মতটা শোনার পর
আমার মতটা ঠিক করি!”
রাজসভা নিস্তব্ধ।
দূরে একটা আসল বানর
গাছের ডালে বসে সব দেখছিল।
সে নিজের মাথা চুলকে ভাবল—
“মানুষ আমাকে দেখে কেন হাসে?
আমি তো অন্তত
কলা পাওয়ার জন্যই লাফাই—
এরা তো চেয়ারের জন্য
কত কী করে!”
তারপর বানরটা একটা কলা হাতে নিয়ে
রাজপ্রাসাদের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমার কলা শেষ হলে
আমি গাছ বদলাই,
আর ওদের লাভ শেষ হলে
ওরা আদর্শ বদলায়!”
এই বলে বানরটি চলে গেল।
মোসাহেব থেকে গেল।
কারণ বানরের বাসা জঙ্গলে,
আর মোসাহেবের জঙ্গল—
ক্ষমতার চারপাশে।
যুগ বদলেছে।
রাজা এখন সবসময় মুকুট পরেন না,
রাজসভাও সবসময় প্রাসাদে বসে না।
তবু মোসাহেব আছে।
অফিসে আছে,
কমিটিতে আছে,
সভায় আছে,
মঞ্চে আছে,
মাইকের পাশে আছে,
ক্ষমতার দরজার সামনে আছে।
সে সব জানে,
সব বোঝে,
ভুলও চিনতে পারে—
শুধু ভুলকে ভুল বলার সময়
তার জিহ্বাটা হঠাৎ
সরকারি ছুটিতে চলে যায়!
তাই মোসাহেবকে চিনতে
তার ডিগ্রি দেখবেন না,
তার বক্তৃতাও শুনবেন না।
শুধু দেখবেন—
ক্ষমতার মানুষটি ভুল বললে
সে কী করে।
যদি প্রতিবাদ করে,
সে সহকর্মী।
যদি চুপ থাকে,
সে সুবিধাবাদী হতে পারে।
আর যদি উঠে দাঁড়িয়ে বলে—
“স্যার! এমন অসাধারণ ভুল
পৃথিবীর ইতিহাসে
এর আগে কেউ করতে পারেনি!”
তাহলে আর সন্দেহ করবেন না।
মোসাহেব এসে গেছে।
আর তাকে তাড়ানোর চেষ্টা করেও
বিশেষ লাভ নেই।
কারণ দরজা দিয়ে বের করে দিলে
সে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলবে—
“স্যার, দরজা দিয়ে আমাকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অসাধারণ ছিল—
তবে জানালাটা খোলা রাখার দূরদৃষ্টি আরও অসাধারণ!”
