অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় - এর গুচ্ছ কবিতা
বীরসিং মাহাতো
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
তোমাকে অনুসরণ করেই—কানুদা, ছোটকু, পিচিক বাচ্চু, নীলু আর আমি—প্রথম কলেজ মাঠ পেরিয়ে, পীরতলার মাঠ পেরিয়ে, চাঁদমারির সেই দিগন্তছোঁয়া বিস্তৃত মাঠ দেখেছিলাম। লালমাটির টিলা, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী ঘর।
তুমি দীর্ঘদেহে সামনে হাঁটতে, আমরা একে একে তোমার পেছনে। মাঝে মাঝে কোনো জায়গায় থেমে বলতে, এইখানে একদিন... তারপর শুরু হতো তোমার গল্প। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।
কত ফুল, কত ঘাস, কত অচেনা গাছের সঙ্গে যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছ! গাছ থেকে কাঠচাঁপার ফুল পেড়ে হাতে তুলে দিয়ে প্রথম তার গন্ধ চিনিয়েছিলে তুমি।
এইভাবেই একটি বিকেল গড়িয়ে গভীর সন্ধ্যা নেমে আসত। আমরা একে একে নিজেদের বাড়িতে ঢুকে যেতাম। আর তুমি অন্ধকার পথ ধরে ফিরে যেতে অনাথ আশ্রমের সেই নির্দিষ্ট বিছানায়। তোমার নিজের বলে কোনো বাড়ি ছিল না।
আজ কানুদা নেই। ছোটকু নেই। নীলু কোথায়, জানি না। আছি শুধু আমি আর পিচিক বাচ্চু।
তবু বারবার মনে পড়ে তোমাকে—বীরসিং মাহাতো।
জানি না, তুমিও আজ কোথায়।
তবু হৃদয় এখনও তোমাকেই খোঁজে।
শেষ ঠিকানা
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
একটা সময় মনে হচ্ছিল যে আমি থেকে আমরা হয়ে একটা যৌথ জীবনপথ তৈরি হয়ে যাবে।
সন্তর্পণে একটা নৌকা পাড়ি দেবে বহুদূর।
কিন্তু এখন-
ঐ সমুদ্র তীরে দাঁড়ানো একাকী গাছের মতন জীবন। কেউ পাশে নেই। চারিদিক জুড়ে শূন্যতা। এখানে দিন ও রাত্রি সমার্থক।
এখন যেন এখানে ছড়ানো নীরবতা
সমুদ্রবাতাস বয়ে যায় দিক নির্দেশ বিহীন।
ক্রমাগত ঢেউ ভাঙে আপন খেয়ালে।
সেও সঙ্গ দিতে অপারগ।
মনে হয় এটাই শেষ ঠিকানা।
অস্থিরতার শূন্যপথে
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
কেন যে অস্থিরতা-
বুঝে উঠতে পারি না কখনো
কিসের জন্য এতো আকুলতা
তাও বুঝেও উঠতে পারি না।
মনে হয়ে কী যেন এখনও
বাকী থেকে গেলো কোথাও।
উতলা হাওয়ার মতন
মনে হয় যেন কোথাও উড়ে যাচ্ছি -
না আছে কোন দিক
না আছে কোন চেনা পথ।
বলো, পাখিরও তো
থাকে ঠিকানা -
কিন্তু আমার নেই
কোন নির্দিষ্ট স্থান।
মনে হয়, এখনও কতো
না - বলা কথা রয়ে গেল আঁধারে
মিথুন লগ্নের জাতক
তবুও মাথার ভেতর চিন্তারা
অদ্ভুত এক শূন্যে ঘুরপাক খেয়ে
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়
আরও গভীর শূন্যতার দিকে...
