কবি নাসরীন খান - এর একগুচ্ছ কবিতা

 


কবি পরিচিতি: কবি নাসরীন খান- এর পুরো নাম  নাসরীন আকতার খানম,জন্মস্থান নেত্রকোনা, ঢাকায় স্থায়ী বসবাস, পিতা - হাবিবুর রহমান খান পাঠান ( রিটায়ার্ড প্রধান শিক্ষক,  শিকদার হাট উচ্চ বিদ্যালয়)। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি করেন। অনুপ্রাস জাতীয় সংগঠন এর মাধ্যমে তাঁর সাহিত্য চর্চা শুরু। ১৯৯৫ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর স্বামী ডক্টর মোহাম্মদ রাজু আহমেদ ( বিসিএস)  উপ সচিব। তাঁর দুই সন্তান। বড় সন্তান নাসিফ আহমেদ নাফি ইন্জিনিয়ারিং এ অধ্যয়নরত অস্ট্রেলিয়ায়। মেয়ে নওশিন নাওয়াল আদৃতা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত।

       বর্তমানে বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা সহ দেশি বিদেশি অনেক পত্রিকায় গল্প ও কবিতা লিখছেন। তাঁর রচিত বই- শেকড়ের টানে ভালবাসার অনুভবে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে নোঙ্গর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে গল্পগ্রন্থ রোদ্র ছায়ার খেলা ২০২২ এর বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে। অনুরণন যৌথ কাব্যগ্রন্থটি তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ২০২২ এর বইমেলায়। ২০২৩ এ তাঁর সম্পাদিত বই উত্তরের হাওয়া বইটি বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ছায়াসঙ্গী।  ২০২৫ এ প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ - আরশিতে আরশ। সমাজ সেবা ও সাহিত্য চর্চায় নিজেকে বর্তমানে নিযুক্ত রেখেছেন।



নববর্ষের শুভেচ্ছা
নাসরীন খান

নববর্ষ আসে নতুন জীবন উদ্যমে
যা সুন্দর, যা শুদ্ধ তা পুরোদমে
পুরাতন থেকে নেব শুধু ভালো
ভুলে সব ভেদাভেদ, সব কালো
মায়ার মায়বী বন্ধন আরো নিখুঁত
দূরে যাক বাধা আছে যত অনাহুত
একটি পৃথিবী একটিই আবাসস্থল
ছুটে আসো নবীন পুরনো ভাঙার দল
মনে প্রাণে নতুন, মনে জাগাও উচ্ছ্বাস
বাঁচতে নতুনে ফেলো না দীর্ঘশ্বাস
বিরহীর মতন উদাসীনতা আর নয়
কেন বুকে শুধু তিমির হাহাকার বয়
শুভ হোক পথচলা সুন্দরের তরে
বাঁচতে নতুন করে তৈরি প্রাণ ভরে
নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হোক
হীনমন্যতা, জরা সব দূরে রোখ।



স্বপ্নস্রষ্টা পথ দেখায়
নাসরীন খান

স্বপ্নদ্রষ্টা কল্পনার জগৎ ছুঁয়ে
আঁকিবুঁকি খেলে মনের গভীরে,
ছড়িয়ে দেয় মনের জানালায়
কখনো চাঁদ, কখনো আকাশ
নিশানার গভীরতা নড়বড়ে।
সাধ্যকে আয়ত্বে রেখে
আঁকে না প্রতিচ্ছবি তার,
অযাচিত কল্পনারা খেলে অবিরত।
শক্ত ভীত ধরে এগুয় স্বপ্নশ্রষ্টা
একটু একটু করে লক্ষ্যে পৌঁছে সে,
স্বপ্ন দেখায় সহস্র জনকে।
প্রথমে স্বপ্নের ছবি আঁকে মস্তিষ্কে
তারপর  গড়ে নিজেকে পরিশ্রম আর
সততার মাস্তুল ধরে।
ধেয়ে চলে ক্রমাগত বিশ্বজুড়ে
আলোকদ্বীপ্ত রেখা উজ্জ্বল নক্ষত্রসম
গন্তব্যের নিশানা ছুঁয়ে পথ দেখায়
তৈরী  করে আরও স্বপ্নস্রষ্টা।


ঝড়ের মাতম
নাসরীন খান

যাইনি অবেলায় ঘাটে নিতে জল
কদম ফোটবে ত্বরা করে তাই চোখ টলটল
গগণ গহনে বাতাস উদ্বেলিয়া আঁচড়ে পড়িছে
ভাঙে ডালপালা ঝরিছে আম্রবালা উঠুনে রহিছে

এসেছে ঈশানে পূবালী বায়
কে আছো কোথায়
কাঁদন লুকিয়ে  যাতন সহিবে যেন গন্ধরাজ খোঁপায়
ঘরের চালা গাছের ডালা উড়িছে ঝড়ের মাতমে
ভাসিছে,উড়িছে সোহাগ সংসার আর না থামে

তবুও আসে বছর ঘুরে কষ্টে সগলের বুক ফাটে
না সারিতেই ঘা আবার হানছে জমিনের বাটে
দক্ষিণের সাগর উন্মাদ প্রতিবছর নানান নামে
স্বপন কাড়ে নার্গিস,আইলা,মহাসেন তবু না থামে।।


রহস্যময়তা
নাসরীন খান

জটিল  আর কুটিল  মনে
রহস্য খেলে
ধরাছোঁয়ার  বাইরে  রয়
অজানাকে মেলে।
বিভেদের  পরিসীমায় ভাল মন্দ
লুকিয়ে  থাকে
রহস্যময়তার আড়ালে  সূর্য
কলঙ্কে ঢাকে।
বোধের বালাই তমাসাচ্ছন্ন
কথার প্যাঁচে
খোলা  হৃদয়ে রহস্যময়তা
থেমে  গ্যাছে।
বিবেচনা করলে তা ঘোর
অমানিশায় মত্ত
ভালর সাথে মিশেলে পার
মন্দ রোখে যত্ত।
সদা অবিচল সত্য কথনে
রহস্যময়তা কাটে
কুটিলতা  দূরে এগোয় সামনে
বাঁচে  ঠাঁটে।



অবহেলা
নাসরীন খান

তুমি  অবহেলা করলে
আমার  আমিকে হারিয়ে ফেলি
অতীত তখন সামনে দাঁড়ায়
তখন  অতীত  নিয়ে খেলি।
প্রেমিক  ছিলেনা কখনো
বুঝতে  চাওনি  তাই আমাকে
ভালবাসা নয় দায়বদ্ধতা
নিছক হেয়ালিপনার ডাকে।
বুঝতে  চাওনি, ধরতে চাওনি
শোপিচে সাজানো ডালা
যখন খুশি খেলেছ,ছুড়েছো
হেয়ালি মনের মালা।
শুধু  খেলার সঙ্গী  হব
ভাবনায় কেন নই?
যখন যেমন ছুঁবে, ধরবে
আমরণ ভালবাসায় কই?
অবহেলিত এক মোম শিখা
পুড়িয়ে পুড়িয়ে  ক্ষয়
এ কোন খেলা খেলছ সদা
ভালবাসায় বা আপনে নয়।



জামানা
নাসরীন খান

আমলার ভাবে বাকী সব কামলা
ভন্ডদের দখলে যেমন মামলা,
চক্রান্তকারী   পায় ফুল তোড়া
ভাল মানুষকে বানায় চোরা।
সব জায়গাতেই  ভেলকিবাজি
তাতেই  সব, চলে কারসাজি।
চাটুকার চ্যালাদের বড় কদর
দামের চেয়ে বেশি তাদের দর
সব জায়গার একই চিত্র
বুঝা ভার কে শত্রু,কে মিত্র।।



ফেলে আাসা শৈশব
নাসরীন খান

কত কথা আর কত স্মৃতি
ভীড় করে জীবনের চাকায়
ছোট্ট মনটা মায়া খুঁজত
উড়ত যেন প্রজাতির পাখায়।

উতাল নদে মাছের  জলকেলি
নৌকায় করে ঘুরে ফেরা
শাপলায় মালা, নারিকেল পাতায়
ঘড়ির সময় দেখা অভিনয় ঘেরা।

চড়ুইভাতি আর মিছেমিছি  রান্না
আগুনের ধোঁয়ায় চোখে  জল
ভাগাভাগি  নিয়ে  কত হাতাহাতি
চুরি করে মুরগী ধরা,গাছের ফল।

এক সাঁতারে নদী পার বাজি ধরে
জোঁকের ভয়ে নেই তোয়াক্কা
আগুন জ্বেলে কয়লা দিয়ে
ফুঁকতে ফুঁকতে টানতাম  হোক্কা।

দিনগুলো এখন স্বপ্নের ছায়া
ফেলে আসা দারুণ  শৈশব বেলা
কল্পনার খোরাক আজ আমার
যেন সেকাল নিয়ে  করি খেলা।।


বদলের সীমানায়
নাসরীন খান

ছোট্ট  হাতদুটো একদিন
মায়া বাড়ায়,স্পর্শতায়।
নির্ঘুম রাত,পাহারায় মগ্ন
বাবা,মায়ের তবুও সুখ
ঠিকানা খোঁজে রক্তের কাছে।

একদিন  বড় হয় ওরা
যশ,খ্যাতিতে বিসর্জন  দেয় ত্যাগ
ওদের জন্য  চিন্তা  বাড়ে,
যত দিন পেরোয় চিন্তাগুলো
আরও পোক্ত হয়,
কখনো  সফল, কখনো  ব্যর্থ।

মনে হয় ছোট্ট দেহ, ছোট্ট  হাতদুটিই
পরম মমতা মাখানো  ছিল নিশ্চিত
আদর আর ভালবাসায় জড়িয়ে,
ছোট্ট চাওয়া,আবদার সবই মিষ্টি  ছিল।

বড়ত্বের দোরগোড়ায় এসে
থমকে দাঁড়ায়  কোটি  বাবা,মা
মানুষ  কি হবে আদৌ!
দুঃশ্চিন্তার প্রহর কাটে না যেন।

যে নিশ্চয়তা ঘিরে স্বপ্ন  বাঁধে বুক
তা অনিশ্চয়তায় ঘিরে বেদনাতুর হয়
কজন মানুষ  হয়,সম্মানিত  করে?
এত ত্যাগ,শ্রম আর ভালবাসার
মূল্যায়িত হয় ক' জনার?
জিম্মি  হয় জীবনের বৃদ্ধ চাকা।।

জীবনের  সীমানায় বাঁকে
নিত্য অভিশাপে গুমরে কাঁদে
মন আর আহত আশারা,
পদদলিত  হয় স্বপ্নের  বুনন
কৌশলে  দমিত করে বাসনা
আর নির্ভরতার সীমানা।।


ভালবাসার দায়বদ্ধতা
নাসরীন খান

ভালবাসার দায়বদ্ধতা দু তরফের
একলা যদি বয়ে যায় ঢের
বেশীদিন টিকে না জোর
বদল হয়ে কেটে যায় ঘোর
নির্ভরতা আর দরদ দুজনের
এক হাতে তা নয় পূরণের
জটিল সমীকরণ মেলানোর
সার্থক তখন  মনভুলানোর।।



সাধারণের আমি
নাসরীন খান

আমি  তুচ্ছ, ক্ষুদ্র অতি সাধারণ,
জ্ঞান বলতে বাংলা বর্ণমালা
গেঁথে চলি নিশিদিন কাব্য সংলাপ।
উচ্চ আশা ------------
ঘনীভূত নয় মনের খোলসে।
মুর্খ অতি  জ্ঞান গর্ভ নেই কোন
দখলে চলে না তাই অন্য কিছু।
জীবনের রং কবিতা মিশেল
রঙের আবডালে কলমের কালি,
অতি ক্ষুদ্র তাই ছাপোষা মানব।
গরিমা বা অহমে অন্ধ নই
মিশি সাধারণে।
মাটিির সোঁদা গন্ধ গায়ে
পারফিউমে পরে না ঢাকা,
বৃষ্টি জলে মিশে একাকার
একেবারে  গেঁয়ো।
ভালবাসে যারা তাদের  আমি
বুনো ফুলে সুবাসিত।
সাধরণেরই চেয়েছি হতে
লালিত স্বপনে কিংবা জাগরণে।।



লোক উৎসবে বাংলা
নাসরীন খান

আজ যে আমি ঋণী বহুবিধে
পুরানোকে ঘেটে বাংলার
লোক উৎসবে বাংলা সাজে
ফিরে যাই মাটির টানে।
নকশীকাঁথায় হাজারো গল্পে,
টেরাকোটার গাঁথুনিতে,
শীতলপাটি বুননে,
চরকি আর নাগরদোলায়,
বাউল, ভাটিয়ালি গানে,
যাত্রা পালার মঞ্চে,
নৌকা বাইচ,মাঝিদের  গানে,
খুঁজি পুরনোকে নতুন করে।
লোক উৎসব  মানে
নিজেকে ফিরে পাওয়া
বাংলার সকল সংস্কৃতিকে
উৎসবে একসাথে বিলীন হতে হতে
হারিয়ে যাচ্ছে  কালের গহবরে
বিলুপ্ত প্রায় আধুনিক মেকির কাছে।।



আশা
নাসরীন খান

আশার বুনো  জাল
কখনো টালমাটাল,
ধৈর্যরা  দেয় ভরসা
আঁধার সরে সহসা,
আঁধারের হাতছানি
যদি নেয় কাছে টানি,
হাল ছেড়ো না বন্ধু
বৃথাই ভাবনা শুধু,
হাতে রেখে আশারা
সুখ  দিবে ইশারা,b
আশাহত মন ওরে
বাঁচার  ইচ্ছে  মরে,
আশারা বাঁচায় দীর্ঘ
প্রতিষ্ঠা  পায় শীঘ্র।








Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url