আলফ্রেড নোবেল : আলোর বিস্ফোরণ, কলমে - ড.সাবিনা ইয়াসমিন

 

ড.সাবিনা ইয়াসমিন
আলফ্রেড নোবেল : আলোর বিস্ফোরণ
ড.সাবিনা ইয়াসমিন


স্টকহোমের কুয়াশা ঢাকা শীতের ভোরে যখন সূর্যের প্রথম আলো শিশিরভেজা ঘাসের উপর নীরব সোনালি অক্ষরে নতুন দিনের নাম লিখছিল, তখন পৃথিবীর বুকে জন্ম নিয়েছিল এমন এক শিশু যার নাম একদিন রাজা-বাদশাহ, সেনাপতি, কবি, বিজ্ঞানী এবং সভ্যতার ইতিহাসের পাতার চেয়েও দীর্ঘ হয়ে মানবজাতির স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকবে।

একজন প্রকৌশলী পিতার স্বপ্ন, একজন সংগ্রামী মায়ের অশ্রু, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ভবিষ্যতের অদেখা বিস্ময়কে বুকে নিয়ে আলফ্রেড নোবেল ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলেন। অথচ তখনও কেউ জানত না যে এই নীরব ছেলেটির হাত ধরে একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত পুরস্কারের জন্ম হবে।

শৈশবের উঠোন ছেড়ে যখন তিনি রাশিয়ার তুষারঢাকা নগরীতে পাড়ি জমালেন, তখন তার চোখে ছিল কৌতূহল, হৃদয়ে ছিল আগুন, আর মস্তিষ্কে ছিল এমন এক অস্থির প্রশ্ন যা প্রতিটি মহান মানুষকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়—মানুষের সীমা কোথায়, জ্ঞানের শেষ কোথায়, আর অসম্ভবের দরজার ওপারে কী আছে?

যুদ্ধের কারখানার শব্দ, কামানের গর্জন, লোহার গলন, আগুনের উন্মত্ততা এবং মানুষের নির্মাণের অদম্য আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি শিখেছিলেন যে একই আবিষ্কার যেমন সেতু তৈরি করতে পারে, তেমনি একই আবিষ্কার মুহূর্তে হাজারো জীবন ধ্বংসও করে দিতে পারে।

তারপর তিনি হাত বাড়ালেন সেই ভয়ংকর শক্তির দিকে, যার নাম নাইট্রোগ্লিসারিন; এমন এক শক্তি যার ভেতরে ঘুমিয়ে ছিল পাহাড় ভাঙার ক্ষমতা, আবার লুকিয়ে ছিল মৃত্যুর অন্ধকার ছায়াও।

বারবার বিস্ফোরণে গবেষণাগার ভেঙে পড়েছে, বারবার স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেছে, বারবার মানুষ তাকে পাগল বলেছে। কিন্তু যে মানুষ ইতিহাস লেখে, সে কখনও মানুষের হাসি-তামাশাকে নিজের পথের শেষ দেয়াল হতে দেয় না।

একদিন সেই আগুন তার নিজের ঘরেও আঘাত হানল। প্রিয় ছোট ভাই এমিল নোবেলকে কেড়ে নিল, পরিবারকে শোকে ডুবিয়ে দিল, আর তার হৃদয়ের গভীরে এমন এক ক্ষত সৃষ্টি করল যার ব্যথা তিনি সারাজীবন বহন করে বেড়িয়েছেন।

কিন্তু মানুষটি হার মানলেন না। কারণ কিছু মানুষ জন্মায় কান্নার কাছে মাথা নত করার জন্য নয়, বরং কান্নাকে শক্তিতে পরিণত করে পৃথিবীর ভাগ্য বদলে দেওয়ার জন্য।

অবশেষে ডিনামাইটের নিরাপদ ব্যবহারযোগ্য রূপের জন্ম হলো। পাহাড় কেঁপে উঠল, সুড়ঙ্গ তৈরি হলো, রেললাইন এগিয়ে গেল, সভ্যতা নতুন গতিতে ছুটতে শুরু করল, আর আলফ্রেড নোবেলের নাম শিল্পবিপ্লবের অগ্নিময় ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লেখা হয়ে গেল।

কিন্তু ভাগ্য তখনও তার জন্য শেষ শিক্ষা তুলে রাখেনি। কারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ কখনও কখনও বারুদের নয়, বিবেকের ভেতরে ঘটে।

এক সকালে তিনি সংবাদপত্র খুলে দেখলেন পৃথিবী তাকে মৃত ঘোষণা করেছে, আর তার নামের পাশে লিখেছে—“মৃত্যুর ব্যবসায়ী মারা গেছে।” সেই কয়েকটি শব্দ তার হৃদয়ে যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, তার শক্তি ডিনামাইটের হাজারো বিস্ফোরণের চেয়েও ভয়ংকর ছিল।

তিনি বুঝলেন, মানুষ তাকে তার সম্পদের জন্য মনে রাখবে না, তার আবিষ্কারের জন্যও নয়; মানুষ তাকে মনে রাখবে সেই পরিচয়ে যা তিনি পৃথিবীর জন্য রেখে যাবেন।

সেই উপলব্ধির দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ, নির্ঘুম রাতগুলোতে তিনি নিজের আত্মার আদালতে নিজেকেই বিচার করলেন, নিজের জীবনকে প্রশ্ন করলেন, নিজের অর্জনকে ওজন করলেন, আর অবশেষে এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন যা ইতিহাসের গতিপথই বদলে দিল।

তিনি তার বিপুল সম্পদ ভবিষ্যতের অজানা বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দিলেন, সেই কবিদের হাতে তুলে দিলেন যারা শব্দ দিয়ে মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালাবে, সেই চিকিৎসকদের হাতে তুলে দিলেন যারা মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, আর সেই শান্তির দূতদের হাতে তুলে দিলেন যারা রক্তের পৃথিবীতে ভালোবাসার বীজ বপন করবে।

এভাবেই জন্ম নিল নোবেল পুরস্কার—একজন মানুষের অনুতাপ থেকে জন্ম নেওয়া মানবতার সবচেয়ে মহিমান্বিত উপহার।

আজ যখন কোনো বিজ্ঞানী নতুন নক্ষত্রের রহস্য উন্মোচন করেন, যখন কোনো কবি একটি কবিতার মাধ্যমে কোটি মানুষের হৃদয় ভিজিয়ে দেন, যখন কোনো চিকিৎসক অন্ধকার রোগের বিরুদ্ধে আলোর পথ খুঁজে পান, কিংবা যখন কোনো শান্তিকামী মানুষ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানবতার পতাকা উড়িয়ে দেন, তখন সেই প্রতিটি সাফল্যের গভীরে কোথাও না কোথাও আলফ্রেড নোবেলের স্বপ্ন নীরবে শ্বাস নেয়।

আর তাই ইতিহাস আজও তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বলে—তুমি শুধু ডিনামাইট আবিষ্কার করোনি, তুমি মানুষের বিবেকের ভেতর এমন এক আলো জ্বেলে গেছ, যার দীপ্তি তোমার মৃত্যুর শত শত বছর পরেও পৃথিবীর আকাশে নক্ষত্রের মতো জ্বলছে, জ্বলবে, এবং যতদিন মানবসভ্যতা বেঁচে থাকবে, ততদিন জ্বলতেই থাকবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url