নদীর সাথে মগ্ন হয়ে - সামসুজ জামান

 

সামসুজ জামান - এর ফটো


নদীর সাথে মগ্ন হয়ে

   সামসুজ জামান 


ছোট থেকেই শুনে আসছি কথাটা। কোন ছাত্র পরীক্ষাতে গরু রচনা মুখস্থ করে গিয়েছিল। ফ্যাসাদ বাঁধলো- ছাত্র যখন দেখলো পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে নদীর রচনা! কিন্তু বুদ্ধি থাকলে তো খেটে খেতে হয় না। ছেলে শুরু করেছিল গরুর চারটি ঠ্যাং ইত্যাদি ইত্যাদি । পরে চট করে গরুকে  নদীর পাড়ে ঘাস খেতে নিয়ে গিয়েছিল। ব্যাস লাইন পাওয়া গেল। নদী তো কাছে ই। সুতরাং এরপর-  এই ঘাস নদীতে হয়, নদীতে বন্যা হলে দুকুল ডুবে যায়, বহু মানুষ মারা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি নদীর যাবতীয় ভালো-মন্দ কথা!

যাক বাজে কথা বাদ দিয়ে আসল নদীর কথা বলতে গেলেই যে গান মনে পড়ে ,সকলেরই বোধ হয় বেশ প্রিয় - গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা ও শ্রদ্ধেয় হেমন্ত সুরারোপিত ও গীত  -"ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে/বলো কোথায় তোমার দেশ/তোমার নেই কি চলার শেষ/ও নদীরে...."। গানটা শুনতে শুনতে এক ধরনের বেশ ভাবালুতা আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে একটু দার্শনিক দার্শনিক করে তোলে। তবে বড় নদীর কথা পরে প্রথমে ছোট নদী দিয়ে শুরু করা যাক।

"আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে"। এই কবিতাই তো আমাদের ছেলেবেলা। এই কবিতার মধ্যে দিয়েই রবি ঠাকুর আমাদের আত্মিক যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিলেন নদীর সঙ্গে। কিভাবে যেন নদী আমাদের মায়ের মতই ,বড় আপনজন হয়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে। তবে নিজের গ্রামের কথায় প্রথমে বলি। আমার গ্রামের পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে এমনই ছোট্ট নদী গাঙ্গুর। সে সময় তো পুতুল নাচ হতো গ্রামে গঞ্জে। সতী বেহুলা, দেখতে দেখতে কেন জানিনা মনে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল - আমাদের ঘরের মেয়ে মনসামঙ্গলের বেহুলা, এখান দিয়েই তো নৌকা ভাসিয়ে লক্ষিন্দর কে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল! স্বপ্নচক্ষুতে দেখতে পেতাম সে ছবি। আচ্ছা দেখতে পেতাম বললাম কেন, আজও সেই মনটা যেন বেহুলা কে দেখতে পায়- একটা কলার ভেলায় চড়িয়ে লক্ষিন্দর কে নিয়ে ফিরছে। জ্ঞান বুদ্ধি কিছুটা হলে জেনেছি এটা আসলে ডিভিসির কাটা খাল। কিন্তু মন মানলে তো? শুনলেই মন প্রতিবাদ করে ওঠে রে রে করে - বললেই হবে ডি ভি সি-র কাটাখাল! এটা ১০০ ভাগ গাঙ্গুর নদী! আর তাই এই প্রৌঢ় বয়সেও  এসেও মন থেকে সেই বিশ্বাস যেন সত্যি সত্যি মুছে ফেলতে পারিনি। তবে হ্যাঁ, বৈশাখে সত্যি সত্যি তার হাঁটু জল ই থাকত । সুযোগ পেলেই সেই নদীর ধারে গিয়ে পাশের ঝোপঝাড় , বৈঁচি ফল এসবের সাথে মনের কত কথাই না বলতাম। আরো একটা ব্যাপার। যেহেতু গাড়ি ঘোড়া ছিল না, হেঁটেই স্কুল যাতায়াত করতাম ,আমাদের স্কুলের পথ সংক্ষিপ্ত করে নেওয়ার জন্যে প্রধানত এই নদী পারাপার করেই আমরা স্কুল যেতাম । কোমর পর্যন্ত জল থাকলেও কুছ পরোয়া নেহি, চারিদিকটা একবার দেখে নিয়ে স্কুল ব্যাগের সঙ্গে পরনের জামা কাপড় গুলোকেও মাথার উপর ধরে নিশ্চিন্তে পার হয়ে যেতাম।

পরিস্থিতি আমাকে এই নদী থেকে সরিয়ে আন্দামানে টেনে নিয়ে গেলেও মন গাঙ্গুরের কাছেই পড়ে থাকত। পাকাপোক্ত ভাবে শিক্ষা বিভাগে যোগদান করে প্রথমেই গিয়ে পড়লাম উত্তর আন্দামানের সর্বোচ্চ পাহাড় স্যাডেল পিক থেকে বয়ে যাওয়া উত্তর আন্দামানের একমাত্র নদী কালপং-এর কাছে। এখানেও ঘিরে রেখেছিল সেই সুখ-স্বপ্ন। তুমি দেখলেও তোমার মনে হবেই কবি নজরুল নির্ঘাৎ এখানে এসেছিলেন। না হলে লিখতেই পারতেন না - "আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।/ ওই পাহাড়ের ঝরনা আমি, উধাও হয়ে বই"! যখন নবীন নগরে সরকারি আবাসনে থাকতাম, তখন পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালপং-এর সাথে খুনসুটি করার কী আনন্দ! কী ভালোবাসা সেই কালপং-এর সাথে। বদলি হওয়ার আগে নয় নয় করে ১৪ বছর তার সাথে সুখে-দুঃখে ঘর করলাম। তবে বাস্তবের তোমার আমার ভালোবাসার জনের মতই সে অভিমানিনী ও, মাঝে মাঝে ফুঁসে উঠে কত ঘর বাড়ি, জমি জায়গা ভাসিয়ে দিত! পাহাড়ি নদী সুতরাং কিছুটা বৃষ্টি হলেই বিপদ। এমনিতে মৃদু স্রোতের নদী কিন্তু পাহাড়ের ঢল যদি নেমে এসেছে নদী দিয়ে তাহলে তার রূপই আলাদা। ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রাম-গ্রামান্তর ভেঙে বিদ্যালয়ে পৌঁছালো। তারপর হয়তো নামলো প্রবল বৃষ্টি। ব্যাস তাদের বাড়ি ফেরা হলো না। নদী তখন একেবারে ফুঁসছে । একবার প্রচুর বৃষ্টি। কালপং তার জলের তোড়ে চার/ চার জনকে , ভাসিয়ে নিয়ে মৃতদেহগুলো সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলের মাঠে এনে ফেলেছিল! আর একটু নিচু এলাকা বলে পার্শ্ববর্তী সরকারি কোয়াটার থাকা একটা এলাকার নাম ছিল বাংলাদেশ । কতবার যে ঢল নেমে নদী ভরে বাংলাদেশ ডুবেছে। তবে দশম শ্রেণীতে পড়াতে হতো রবি ঠাকুরের নববর্ষা। বাংলাদেশ কোয়াটার্স যখন ঢুকতো তখন ছাত্র-ছাত্রীরা একেবারে জল জ্যান্ত উদাহরণ খুঁজে পেতো - তীর ছাপি নদী কল কল্লোলে এলো পল্লীর কাছে রে/ হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মত নাচেরে।"

তবে আমাদের আন্দামান যাতায়াতের প্রথম পর্বে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জল জাহাজ। গঙ্গা নদী দিয়েই তার যাত্রা। খিদিরপুর ডক থেকে মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১২৫ কিলোমিটার বিস্তৃত হুগলি নদী। পশ্চিমবাংলা ছেড়ে কালাপানির দেশ আন্দামানে পাড়ি দিতে মনের যে ব্যথা বেদনা তা যেন মাতৃস্নেহে অনেকটা মুছিয়ে দিত আমাদের পবিত্র গঙ্গা। হাওড়া মেদিনীপুর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এই তিনটি জেলা অতিক্রম করতে হতো গঙ্গা দিয়ে যাত্রার সময়। গঙ্গার পাশের পলি পড়া, মাটিতে সবুজ শ্যামল ঘাস এবং দুই পাড়ের চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক শোভা যে কী অসাধারণ সেটা যিনি না দেখেছেন তাঁর কাছে বর্ণনা করা প্রকৃতই দুঃসাধ্য! একেবারেই অবর্ণনীয় অকল্পনীয় অনির্বাচনীয় ইত্যাদি ইত্যাদি, যত রকমের ভালোলাগা অনুভূতি বোঝানোর ভাষা আছে সব গঙ্গার শোভার কাছে একেবারে ডাহা ফেল! মনোরম প্রাকৃতিক শোভা ছেড়ে দিয়ে জাহাজের ডেক থেকে কেবিন বা বাঙ্কে ফিরে আসা সত্যিই সে কঠিন ব্যাপার। আবার তার মাঝে দেখতে পাওয়া যাবে পার্শ্ববর্তী এলাকার ডাকাবুকো ছেলেদের দল নৌকার মাঝে খেলা করতে করতে ঝপাং করে চলে ঝাঁপ! আপনার ছেলেবেলা মনে পড়ে যাবে। মনে হবে আহা একবার যদি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতাম। কিন্তু সে কি আর হবার জো আছে? সুতরাং গতস্য শোচনা নাস্তি! মাঝে মাঝে পলি পরে গঙ্গা বুজে যাওয়ার অবস্থায়। এই চরা দেখেই আপনার হয়তো মনে পড়ে গেল শিবনাথ শাস্ত্রীর ইংরেজি শিক্ষার অভ্যুদয় নামের সেই লেখার কথা। এইরকম নদীর চরাতেই জাহাজ আটকে গিয়েছিল। দুই তীরে মানুষজনের ভিড় চেঁচামেচি। সাহেব বাঙালি কর্মচারীকে ওই চেঁচামেচির কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। ইংরেজ সাহেবকে ইংরেজিতে বোঝাতে সেই বাঙালি কর্মচারী বলেছিল-"স্যার, স্যার, শীপ ইজ এইটটি ওয়ান!" সাহেব তো ভিড়মি খাওয়ার জোগাড়! পরে অনেক কষ্ট করে নিজে একদিকে হেলে কর্মচারী বুঝিয়েছিল যে সে জাহাজটা আসলে একাশি হয়ে গেছে- মানে একদিকে হেলে চরাই বসে গেছে। সাহেব নিশ্চয়ই কর্মচারীকে, বকশিশ দিয়েছিলেন ভালো মতোই এমন সুন্দর চেষ্টায় ইংরেজি করে ব্যাপারটা বোঝানোর জন্যে!  হ্যাঁ হচ্ছিল নদীতে পলি পরে চরার কথা। সেসব সমস্যা বাঁচানোর জন্য ড্রিলিং করে গঙ্গার গভীরতাকে সুচারু রাখা হয়।আর ওই নদীর যে ক্রমশ অমন প্রশস্ত চেহারা হবে, এক সময় দুই কুল চোখ থেকে হারিয়ে যাবে তা প্রথমে ভাবা না গেলেও শেষে বিস্ময়ে পরিণত হয়। তখন মনে পড়বে মুকুল দত্তের লেখা ও কিশোর কুমারের কন্ঠ নিশ্চিত গান -"এই যে নদী যায় সাগরে/ কত কথা শুধাই তারে/এত জানে তবু নদী, কথা বলে না.... কথা বলে না... কেন বলে না?? চিরকালীন এই বিস্ময় রেখে দিয়েই এক সময় তার ভালোবাসার বন্ধন সাগরে মিলিত হয়ে তবে হয়তো সে সার্থকতা পায়।

তবে সবকিছু কি ছবির মত শুধুই ভালো। কালো কি নেই? সে কথা তো বলিনি মোটেই। জাহাজ ঘাটা থেকেই আপনার মনে প্রশ্ন জাগাবে নদীর বুকে ভাসমান তেল কালি নোংরা আবর্জনা! উফ! গঙ্গার এই চলমান পথে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে কত বিষাক্ত রাসায়নিক যে নামছে! আর কোথা থেকে নদী এ ভাসিয়ে আনছে কত রকমের নিষিদ্ধ বর্জ্য পদার্থ সে কথা বলে কাজ নেই। ভদ্রলোকেরা ভালো কথা কানে নেয় না। সভ্য সমাজের আধুনিকতার বিস্তারে অর্থই সকল অনর্থের মূল। সুতরাং অর্থ প্রাপ্তির তাগিদে আর রেষারেষিতে এমন বিষাক্ত বর্জ্য নদীর বুকে ফেললে কার কী এসে যায়? তবুও শেষমেশ এই অকেজো কথা কে নিয়ে একটু ভাবুন না! কানে দিচ্ছি শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ,ভূপেন হাজারিকার সেই গান- "বিস্তীর্ণ দুপাড়ে/ সহস্র মানুষের/ হাহাকার শুনে ও গঙ্গা তুমি/ ও গঙ্গা বইছ কেন"?

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url