নাগরিক অধিকার, আদালত, আমেরিকা ও ভারত - খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

 








নাগরিক অধিকার, আদালত, আমেরিকা ও ভারত

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী


সরকারের তিনটি বিভাগ। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এদের মধ্যে আইন বিভাগের কাজ হোল আইন তৈরী করা। শাসন বিভাগের কাজ হোল দেশ শাসন করা। বিচার বিভাগের কাজ হোল ন্যায়বিচার প্রদান করা। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আজকের যুগ হোল দল ব্যবস্থার যুগ। কি উদারগণতন্ত্রে, কি সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রে সর্বত্রই রাজনৈতিক দল দেশ শাসন করে। রাজনৈতিক দলের লোকরাই আইনসভা ও প্রশাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্বভাবতঃই যাতে আইন বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগের মঞ্চকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলের লোকরা নাগরিকদের অধিকারকে ভঙ্গ করতে না পারে, তার জন্য বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানে আদালতকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। 

আমরা এখানে বিশ্বের দুই বৃহৎ উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দেশ আমেরিকা ও ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে নাগরিক অধিকার রক্ষায় আদালতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। একথা ঠিক যে অনেক ব্যাপারে ভারত ও মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিতর ব্যাপক পার্থক্য আছে: (১) ভারত একটি সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ। আমেরিকা হোল একটি রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রিক দেশ। (২) ভারত হোল একটি আধাযুক্তরাষ্ট্রীয় দেশ; কিন্তু আমেরিকা হোল একটি আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশ। (৩) ভারতবর্ষে ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতি নেই কিন্তু আমেরিকায় সেটা আছে। (৪) আমেরিকায় দ্বৈত সংবিধান দ্বৈত নাগরিকতা, দ্বৈত আদালত, ইত্যাদি আছে। কিন্তু ভারতবর্ষে এসব নেই। (৫) বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে ভারতবর্ষ তার জন্মলগ্ন থেকেই জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতি অনুসরণ করে আসছে, যার মূল কথাই হোল সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ ও নয়াউপনিবেশিকতাবাদের বিরোধীতা করা। কিন্তু, আমেরিকা এসবে বিশ্বাস করে না। সে বিশ্ব রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ ও নয়াউপনিবেশিকতাবাদের ধারক ও বাহক হিসাবে কাজ করে। এখন অবশ্য মোদী জামানায় ভারত তার জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতির আদর্শের কথা ভুলে গিয়ে মার্কিন ঘেঁষা বিদেশনীতি অনুসরণ করে চলছে যার সারবস্তু হোল সাম্রাজ্যবাদের তোষণ।

যাইহোক, ভারত ও মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এইসব পার্থক্য থাকলেও উভয়ের মধ্যে গুণগত মিল আছে। (১) উভয় দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বস্তগত ভিত্তি হোল ধনতন্ত্রবাদ বা উৎপাদন ও বন্টন ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মালিকানা। (২) আদর্শগতভাবে উভয় দেশেই ধর্ম ও রাজনীতিকে পৃথক করে দেখে। পাকিস্থান, ইরাণ, ইরাক প্রভৃতি রাষ্ট্রের মতো ভারত ও আমেরিকা কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়। উভয় দেশেই সংবিধানের মধ্যে নাগরিক অধিকারের তালিকা আছে। উভয় দেশের সংবিধানিক ব্যবস্থায় নাগরিক অধিকার রক্ষায় আদালত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উভয় দেশেই আদালতকে বলা হয় "Guardian of the Constitution" বা সংবিধানের অভিভাবক। উভয় দেশেই আদালত সরকারের স্বৈরাচারের হাত থেকে নাগরিকদের অধিকারকে রক্ষা করে। 

এক্ষেত্রে অবশ্য মার্কিন সুপ্রীম কোর্টের ক্ষমতা অবাধ। তার কারণ হোল (ক) মার্কিন সংবিধান বিশ্বের ক্ষুদ্রতম সংবিধান এবং প্রায় ২৫০ বছরের পুরানো। 

(খ) এই সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয়।

(গ) এই সংবিধানের মধ্যে ""due process of law","just compensation""natural rights"এইসব অস্পষ্ট শব্দে ভরা। এগুলির সময় উপযোগী ব্যাখ্যা দেয় সুপ্রীম কোর্ট। (ঘ) এই সংবিধানের ৩ নং ধারায় মার্কিন সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দাতা হোল মার্কিন সুপ্রীম কোর্ট। তার রায় সবার উপর প্রযোজ্য। এই কারণেই বিশিষ্ট মার্কিন সংবিধানবিদ মনরো লিখেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রীম কোর্ট যেটা বলে, সেটাই হোল সংবিধান। তাঁর কথায়"In America the Contitution is what the Suprime Court Says it is." একই সুরে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংবিধানবিদ অধ্যাপক এস. ই. ফাইনার লিখেছেন যে আমেরিকায় আদালতের বিচার বিভাগীয় সমালোচনার অধিকার হোল তুলনাহীন এবং এর জোরে আদালত নাগরিকদের স্বাধীনতা ও অধিকারসমূহ রক্ষা করে। তাঁর ভাষায়, "In the United States of America, the power of judicial review of the US Supreme Court is unlimited".

আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের মতো আদালতের সর্বময় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখানে সংসদ ও আদালতের প্রাধান্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। তার ফলে মার্কিন সুপ্রীমকোর্টের মতো বা রাজ্য সুপ্রীম কোর্টগুলির মতো আমাদের এখানকার সুপ্রীম কোর্ট বা রাজ্য হাইকোর্টগুলি নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে অতো ব্যাপক ক্ষমতা নেই। তবুও আমাদের দেশের ৭৬ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করে যে নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে হাইনকোর্টগুলি তথা আমাদের সুপ্রীমকোর্ট কখনো কখনো গরীব মানুষদের অধিকারের পরিপন্থী রায় দিলেও, অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রকে সুগম করেছে। যেমন বেলা ব্যানার্জী মামলায়,গোলকনাথ মামলায়, আমাদের দেশের আদালত প্রতিক্রিয়ার হাতকে শক্তিশালী করেছিলো ঠিক যেমন আমেরিকায় "New Deal" প্রশ্নে মার্কিন সুপ্রীমকোর্ট প্রতিক্রিয়ার পক্ষে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টের আর্থসামাজিক সংস্কারের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু গোপালন মামলা, কেশবানন্দ ভারতী মামলা, ইত্যাদি মামলায় আমাদের দেশের আদালত প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রগতির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল তার রায়ের মাধ্যমে। একইভাবে মার্কিন সুপ্রীম কোর্ট ব্রাউন বনাম বোর্ড অফ এডুকেশান মামলায় শিক্ষায়তণে বর্ণবৈষম্যকে বেআইনী ঘোষণা করেছে, সিডিয়ান বনাম ওয়ানবাইট মামলায় দরিদ্র আসামীকে রাষ্ট্রের খরচে আইনী সহায়তা দেবার নির্দেশ দিয়েছে, লোভিং বনাম ভার্জিনিয়া মামলায় গোটা দেশে আন্তঃবর্ণগত বিবাহ চালু করে কৃষ্ণকায় শ্বেতকায় বিবাহকে বৈধতা দিয়েছে।

এছাড়া ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীমকোর্ট "Doctrine of implied rights"ও "Doctrine of implied Powers" বলে নাগরিকদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাম্প্রতিককালে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমী গণতন্ত্রের মধ্যে যেটুকুও স্বাধীনতা সাধারণ মানুষ ভোগ করেন, সেগুলিকে ওয়াশিংটনের ট্রাম্প প্রশাসন ও নয়া দিল্লীর মোদি শাহ প্রশাসন হিটলারের কালা কানুন "Nuremberg Act" এর কায়দায় অজস্র অমানবিক বিধি মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে মানুষের কণ্ঠকে রুদ্ধ করছে। হিটলার যেমন ইহুদি বিদ্বেষে ইহুদিদের মানব অধিকারকে লঙ্ঘন করেছিল, ঠিক একইভাবে মোদি সরকার ও পশ্চিমবাংলার শুভেন্দু অধিকারীর সরকার মুসলিম বিদ্বেষে মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্যকে বিলুপ্ত করছে। আমাদের রাজ্যে বন্দেমাতরম্ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছত্রিশগড়ে হিন্দু দেবদেবীর বন্দনাকে মুসলিম অমুসলিমসহ সবার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের দেশের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বিচারপতিরা গর্জে উঠেছেন। ছত্রিশগড় হাইকোর্ট তার সাম্প্রতিক রায়ে স্পষ্ট করে বলেদিয়েছেন যে কারোর উপরে কোন দেবদেবী ভজনা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বোম্বাই হাইকোর্ট তার সাম্প্রতিক রায়ের কষাঘাতে (বি. জে. পি, আর. এস. এস. এর নাম বা সাভারকার, শ্যামাপ্রসাদের নাম উল্লেখ না করে) সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে সরকার যেন নাগরিকদের ক্রীতদাস না ভাবে।

আসামে ভাষাগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হোল বাঙালীরা। অথচ সম্প্রতি আসামে হিন্দীকে স্বীকৃতি দেওয়া হোল, বাংলাকে উপেক্ষা করে। হিন্দী--হিন্দু--হিন্দুস্থানের প্রবক্তাদের বুলডোজার চলছে ভাষাগত সংখ্যালঘুদের উপরে। আমাদের ধারণা বিষয়টি আদালতে যাবে এবং বাঙালী ও বাংলাসহ সকল ভাষাগত সংখ্যালঘুরা সুবিচার পাবেন। অন্যদিকে আমেরিকায় মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সভ্য দুনিয়ায় স্বীকৃত নাগরিকতা আইন বিধি হোল যে জন্মসূত্র নীতি, তাকে বাতিল করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে রুজভেল্ট, উইলসন, আব্রাহাম লিঙ্কনের পদধূলি ধন্য আমেরিকা বেকে বিতাড়িত করার আইন তৈরী করেছে। মার্কিন সুপ্রীম কোট ট্রাম্পের এইসব সর্বনাশা পদক্ষেপকে বাতিল করে দিয়ে মানবতার জয় ঘোষণা করেছেন। তাতে ট্রাম্প ও মোদী প্রশাসন ভীত---উভয়ের তথাকথিত বিদেশী বিতাড়ন দানবীয় নীতির মুখে চুনকালি পড়েছে। গণতন্ত্র স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের ঢল নেমেছে দেশে দেশে। কিন্তু এতে আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। ভারত--আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বজুড়ে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদেরকে সজাগ থাকতে হবে। তাদের সদা জাগ্রত  মনন ও চিন্তাধারা আদালতসহ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অন্যান্য অংশে যেসব শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষরা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে আছেন, তাদেরকে সাহস দেবে, প্রেরণা দেবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে। আমরা যেন ভুলে না যাই ,হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর হুমকি সত্ত্বেও, রাইখস্ট্যাগ মামলায় কমরেড জর্জি ডিমিট্রিভ ও অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতাদের অকুতোভয় অবস্থান সাহস জুগিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কোর্টকে হিটলারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে কমরেড ডিমিট্রিভকে মুক্ত করতে। আমরা যেন এটা মনে রাখি, এটাই সময়ের দাবী। 



      

লেখক পরিচিতি

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কার ও এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কার প্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। ইনি কোলকাতার সাউথ সিটি (দিবা) কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।

ঠিকানা-শরনিয়ার বাগান

পোষ্ট-টাকী, পিন-৭৪৩৪২৯

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url