ড. সাবিনা ইয়াসমিন - এর একগুচ্ছ কবিতা
কৃতজ্ঞতা
ড. সাবিনা ইয়াসমিন
মানব হৃদয় নিস্তব্ধ এক আয়না— দয়া আর অবজ্ঞার ছায়া সেখানে অনবরত ভাসে।
অদৃশ্য রেখায় লেখা থাকে জীবনের গোপন ইতিহাস— একটি উপকার জ্বালে আলোর দীপ, অকৃতজ্ঞতা ডেকে আনে অন্ধকারের দীর্ঘ নিশীথ।
মনে রেখো— যে হাত ঝড়ের মাঝে তোমায় রেখেছিল আশ্রয়ের মতো, দুর্দিনে যে কণ্ঠ দীপ্তির মতো উচ্চারণ করেছিল তোমার নাম— তার স্মৃতি যেন ধুলায় ঢাকা না পড়ে।
ধন্যতা কেবল শব্দ নয়, এ আত্মার এক শান্ত, গভীর সংগীত।
যেমন ফুল ভোলে না বসন্তের স্পর্শ, তেমন নদী ভোলে না উৎসের প্রথম স্নেহ, তেমনি মানুষ যদি ভুলে যায় তার ঋণ, সে নিজেই হারায় নিজের অন্তর্লোকের দিশা।
অকৃতজ্ঞতা এক শুষ্ক মরুভূমি, যেখানে করুণার জলধারা আর নামে না; আর কৃতজ্ঞতা— এক সবুজ, শ্যামল বাগান, যেখানে স্মৃতি প্রতিদিন ফুল হয়ে জাগে।
হে মানব, স্মরণ করো— পরোপকার কখনো বিলীন হয় না, সময়ের অন্তরে ফল হয়ে ফিরে আসে।
আর যে হৃদয় আলোকে স্মরণ রাখে, অন্ধকার তার পথ রোধ করতে পারে না।
সহমর্মিতা হারায় না কখনো— হারিয়ে যায় শুধু সেই আত্মা, যে তা মনে রাখে না।
শব্দ মুছে গেলেও কৃতজ্ঞতা থাকে, মানুষ ফুরালেও তার আলো ফুরায় না।
ইতিহাসের বাইরে এক কবির আর্তনাদ
ড. সাবিনা ইয়াসমিন
আমি ক্লান্ত নই—আমি ক্ষতবিক্ষত, এই পৃথিবীর নীরব অন্যায়ের ধারালো দাঁতে ছিন্নভিন্ন।
যেখানে যোগ্যতার রক্ত মাটির অন্ধকারে নিঃশব্দে হারিয়ে যায়, আর অযোগ্যতার উল্লাস আকাশে উৎসবের আগুন তোলে।
আমি দেখেছি—প্রতিভা ঝরে পড়ে অন্ধকার গলির নামহীন ডাস্টবিনে, আর শূন্যতার মুকুট পরে নির্বোধেরা রাজা সেজে বসে। সত্যকে—ধূলোর কাছে নতজানু হয়ে কাঁদতে, আর মিথ্যাকে—লোহিত পায়ে তাকে মাড়িয়ে সিংহাসনের চূড়ায় উঠতে।
জ্ঞানীরা আজ নিঃশব্দ—তাদের কণ্ঠ ডুবে যায় করতালের উল্লাসে; আর বোকাদের উচ্চারণেই রচিত হয় সময়ের দলিল।
এই পৃথিবী এক অদৃশ্য বাজার—এখানে বিবেক নিলামে ওঠে, সততা হাত পেতে দাঁড়ায়, আর ন্যায়বিচার—এক বিস্মৃত প্রতিধ্বনি।
আমি চিৎকার করতে চেয়েছিলাম—কিন্তু সময় আমার কণ্ঠ ধার করে নিয়ে গেছে। তাই লিখে গেলাম রক্তের অক্ষরে।
যদি একদিন আমি না থাকি, যদি আমার নাম ধুলোয় বিলীন হয়, তবে এই পঙক্তিগুলো সাক্ষ্য দেবে—যোগ্যতার মৃত্যু হয় না—সে কেবল অদৃশ্য হাতের নিচে থেমে যায়।
যেদিন আমি কবরের নিচে নীরব, সেদিনও বাতাসে ভাসবে এই অনুচ্চারিত উচ্চারণ—এই পৃথিবী কখনোই যোগ্যদের জন্য নির্মিত ছিল না।
আর যদি কোনোদিন ন্যায় ফিরে আসে—জেনে রেখো, সে আমার একার অর্জন নয়; সে হবে—হাজার নিঃশব্দ কণ্ঠের জমে ওঠা প্রতিধ্বনি, যারা ইতিহাসের বাইরে থেকেও ইতিহাসকে রক্ত দিয়ে লিখে গেছে।
বছরের শেষ প্রার্থনা
ড. সাবিনা ইয়াসমিন
বছরের শেষ আলো নিভে আসে ধীরে,
সময়ের কাছে জমা থাকে আমাদের সব হিসাব।
আমি দাঁড়াই নিজের সামনে—
কি হারালাম, কি পেলাম—তার উত্তর খুঁজতে।
যা হারিয়েছি, তা আমাকে শিক্ষা দেয়,
যা পেয়েছি, তা আমাকে প্রশ্ন করে—
আমি কি সত্যিই বেঁচেছি,
নাকি শুধু সময় পার করেছি?
রাত নামে—নীরব, গভীর, চিন্তাময়,
এই নীরবতায় আত্মা নিজ মুখোমুখি দাঁড়ায়।
ভুলগুলো চোখে ভেসে ওঠে,
তবু আশাই শেখায়—আবার শুরু করা যায়।
সময় আমাকে ভেঙেছে,
তাই আমি দৃঢ় হতে শিখেছি,
শূন্যতার ভিতর ফেলে দিয়েছে আমাকে—
আমি পূর্ণতার অর্থ বুঝেছি।
সব হারানো শেষ নয়—
কিছু হারানোই নতুন পাওয়া,
সব অন্ধকার মৃত্যু নয়—
কিছু অন্ধকার নতুন ভোরের শুরু।
আমি প্রার্থনা করি—
নতুন বছর আমাকে ভালো মানুষ করুক,
আমার পরিচয় হোক আমার কাজে,
আর আমার কষ্টই হয়ে ওঠে অন্যের আলো।
বছর শেষ হয়, কিন্তু জীবন থামে না—
নতুন পথ আবার শুরু হয়,
আমি এগিয়ে যাই—
নিজেকে নতুন করে গড়ার আশায়।
