রুবাইয়াত-ই-গাজী আবদুল্লাহেল বাকী

রুবাইয়াত-ই-গাজী আবদুল্লাহেল বাকী

রুবাই ১

উপচে পড়ে প্রেমের গজল বিম্বাধরের দেল ফেটে,
শান্তি ফুলের বয় যে হাওয়া দেখছি আমি রূপ ঘেটে।
গুলিস্তানের একটি গোলাপ ভিন্ন তার ঐ রঙ বাহার,
অধীর জীবন মাতোয়ারা তারই পিছে পথ হেঁটে।



রুবাই ২

আর কতোবার আঁকবে কলম লাল শরাবের আলিম্পনা,
রচবে কতো প্রিয়ার ভূষণ সাকীর রূপের ঢের বন্দনা।
লিখবে কতো দুখের গীতি প্রেম-বিরহের কাঁদন-বেদন,
চলবে মসি সময় সাথে তুমি আমি কেউ জানবো না।



রুবাই ৩

তীর্থ আমার ভ্রমর সাথে কুসুম কুঞ্জে মধু যেথায়,
নীরব ধ্যানে পান করে যাই দ্যুতি ভরা রাজ্য সেথায়।
ঘুরতে দেখি হৃদয় আমার প্রিয়ার চাকের চতুর্দিকে,
লুট করে নেয় ভ্রমর সবে প্রেম-মধু-রস পাপড়ি ঝরায়।



রুবাই ৪

ফুলদানি এক বললো জায়ায়, ‘তোমার আমার অনেক কদর,’
আমার রূপে সাজে টেবিল রূপে তোমার কক্ষ-অন্দর।
শুকাই আমরা হারাই আদর দেখা-দেখির দিন চলে যায়,
ধূলা হয়ে উড়বে হাওয়ায় তোমার আমার রূপের গতর।



রুবাই ৫

কমল কেনো ফুটলো আজি জল-তরঙ্গের তরল বুকে,
হয়তো প্রিয়ার ঘোমটা ফাঁকে আঁখির দৃষ্টি পড়লো ঝুঁকে।
চাটলো আলো পাপড়ী পাতা সন্ধ্যাতারার মাণিক হতে,
কমল কুঞ্জে ফুটলো ছবি অধর ঝরা আবির শুকে।



নোট

ফার্সি শব্দ রুবা অর্থ চার আর রুবাই হলো চার লাইনের স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি কবিতা। রুবাইয়াত হলো রুবাই শব্দের বহুবচন।

রুবাই এর ছন্দের ধরন হলো ক ক খ ক, অর্থাৎ প্রথম চরণের সাথে দ্বিতীয় ও চতুর্থ চরণের ছন্দের অবশ্যই মিল থাকতে হবে যেথায় তৃতীয় চরণটি থাকবে স্বাধীন, অন্য চরণের ছন্দের সাথে মিল থাকতেও পারে, নাও পারে।

রুবাইয়ের তৃতীয় চরণটি স্বাধীন থাকায় ছন্দের দ্যোতনার ক্ষেত্রে একটি ঝোঁক ও লয়ের টান সৃষ্টি হয় যা এই চতুষ্পদী কবিতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করে থাকে।

কতিপয় ফার্সি অলংকার শাস্ত্রবিদ মত প্রকাশ করেছেন যে, যদি রুবাইয়ের তৃতীয় চরণটি ঐচ্ছিক হয়, তাহলে চতুর্থ চরণ স্বাভাবিক ভাবেই একটি গভীর ছন্দময় ধ্বনি ও মাধুর্য সৃষ্টি করবে।

রুবাইয়াতের এ ধরনের স্বীকৃত অন্তমিলই রচনা শৈলীর অনন্য স্বভাব গুণ ও বিশেষ মেজাজ যা অন্য কবিতায় ব্যবহৃত অন্তমিল বা ছন্দের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। এখানে রুবাইয়ের স্বার্থকতা।

রুবাই এর এই বিষয়টি বিশ্ব সাহিত্যে প্রচলিত অন্যান্য ছন্দ প্রকরণ ও ভিন্ন স্বভাবের কবিতা হতে আলাদা হয়ে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে।

রুবাই একটি ধ্বনিময়, ছন্দময়, সাঙ্গীতিক ও বিশেষ ছন্দ বা মিল সম্বলিত কাব্যিক রূপের আকর।

— গাজী আবদুল্লাহেল বাকী



কবি পরিচিতি

প্রফেসর ড. গাজী আবদুল্লাহেল বাকী সাতক্ষিরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার উকশা গ্রামে ১৯৫১ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি জন্ম গ্রহণ করেন। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজিতে অনার্স ও এম. এ. এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ করেন।

গাজী আবদুল্লাহেল বাকী ১৯৭৩ সাল হতে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি প্রথমে কালিগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ, কালিগঞ্জ, সাতক্ষিরা ও ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল ও কলেজ, কুমিল্লা সেনানিবাস, ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ এবং লিবিয়ার শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ইংরেজি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৯১ সালে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

এরপর তিনি খুলনাস্থ নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজির অধ্যাপক ও লিবারেল আর্টস অ্যান্ড হিউম্যান সায়েন্স অনুষদের ডিন, সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির অধ্যাপক ও আর্টস অ্যান্ড মডার্ন ল্যাংগুয়েজ অনুষদের ডিন এবং খুলনা খান বাহাদুর আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ড. গাজী আবদুল্লাহেল বাকী মূলত একজন কবি, লেখক, অনুবাদক, গবেষক ও সমালোচক। তাঁর ১৯৬৭ সাল হতে অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, হাইকু, গবেষণা, অনুবাদ ইত্যাদি ইংরেজি ও বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে। এ পর্যন্ত তাঁর ২৭টি বাংলা ও ইংরেজি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ভারত, আমেরিকা ও ইতালিতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতার মধ্যে বিভিন্ন বিষয় বৈচিত্র্যে ও অনন্য আঙ্গিকে প্রকাশিত তাঁর ‘রুবাইয়াত-ই-গাজী আবদুল্লাহেল বাকী’ ১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড (২২৩৫টি রুবাইয়াত) ২০১৪ ও ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া ‘রুবাইয়াতে রাসুল (সা.)’ (২০২৩) এবং হাইকুগ্রন্থ ‘Songs of Water’ ইতোমধ্যে বোদ্ধা পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

তিনি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের মুখপত্র The College Chronicle-এর সম্পাদক, Khulna University Studies-এর সহযোগী সম্পাদক ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম সম্পাদক, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির জার্নালের এক্সিকিউটিভ এডিটর, Journal of Business, Society and Science-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর এবং লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট-এর The News Bulletin-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিদেশে ১৯৭০ সালে ইউএসআইএস (ঢাকা) কর্তৃক এবং ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে ইতালিতে শান্তির ওপর ‘A Poem for Peace’ আন্তর্জাতিক কবিতা প্রতিযোগিতায় ‘Prize of Merit’ পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর কবিতাগুলো সংস্থার স্পেশাল ক্যাটালগে প্রকাশিত হয়েছে।

আমেরিকার International Society of Poets (ISP) তাঁকে ‘International Poet of Merit’ উপাধিতে ভূষিত করে এবং ডিস্টিংগুইশড মেম্বারশিপ প্রদান করে। সংস্থার বিভিন্ন সংকলনেও তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৯৮ সালে The National Library of Poetry, America তাঁকে ‘Editor's Choice Award’ প্রদান করে এবং ‘Visions’ নামে তাঁর একক ক্যাসেট অ্যালবাম প্রকাশ করে।

দেশের মধ্যে তিনি রাইটার্স ক্লাব পদক (২০০১), খুলনা সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা, এম. এ. রাজ্জাক মদীনাবাদী পদক (২০০৭), নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র সম্মাননা (২০০৭), গবেষণায় খুসাস মাতৃভাষা স্বর্ণপদক (২০১১), কালিগঞ্জ আন্তর্জাতিক সম্মেলন সম্মাননা (২০১৪), স্বাধীনতা মিডিয়া ভিশন, ঢাকা কর্তৃক কবি জীবনানন্দ দাশ পদক (২০১৮), খুলনা কালচারাল সেন্টার কর্তৃক শিক্ষা ও গবেষণায় সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন।

২০১১ সালে জাতীয় অপরাধ-পর্যবেক্ষণ (মানবাধিকার) আইনী সহায়তা সংস্থা কর্তৃক সফল সাহিত্যিক হিসেবে সম্মাননা ও সংবর্ধনা এবং জেলা সাহিত্য পরিষদ, সাতক্ষিরা কর্তৃক সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য সংবর্ধনা-২০২৬ ও সম্মাননা লাভ করেন।

তিনি জাতীয় সাহিত্য পরিষদ, শিল্পকলা একাডেমি (খুলনা) ও বাংলা একাডেমীর জীবন সদস্য। এছাড়া তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ-এর সদস্য।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url