ছয় ঋতু, কলমে - কালাম হাবিব
ছয় ঋতু
কালাম হাবিব
গ্রীষ্ম সাজে,প্রাণ ঝাঁঝে
হয় সূর্য প্রাণবন্ত।
সহসা হয় নিন্দিত, প্রাণে বাজে,
কুন্ঠিত সুর, চলে দিগন্ত দিগন্ত।
সহসা উদ্বেল জীবন্ত প্রাণ,
প্রার্থনা করে একটু আরাম।
আবদারিত একটু ত্রাণ,
বিচলিত মুখে আসে বর্ষার নাম।
‘অহরহ চাল করে হড় হড়,’
বুকের ভেতর কাঁপে দুরুদুরু!
হঠাৎ করে কালবৈশাখী ঝড়!
আনন্দের যাত্রায় করলো কান্না শুরু।
আম্রকানন করে তচনচ দুঃখের
পরিবেশে,দেখা গেলো শেষে,
ফুটলোও হাসি, নিবিড় আশা মুখের,
প্রভাতের রবির আগে এসে।
পর পরে দেখি,
যেথা সেথা গেছে জল জমে;
এতে বর্ষা আমি লেখি,
ক্রমে ক্রমে গ্রীষ্ম গেলো কমে।
সারা ক্ষেত ভরি সবুজ করি মাঠ,
স্বপ্ন লয়ে কৃষক সবে;
সোনার ফসল রোপণ করেছে পাট।
দিলে জল তাতে লাভ হবে;
এইতো কামনা বর্ষার কাছে!
তা তো হয় না, তাদের অজানা
বর্ষার গোপন কথা আছে!
আচমকা দিবে বুঝি হানা।
সারাদিন গুড় গুড়, গুরু গুরু,
সারা নীল চাল হয়ে গিয়ে কালো।
ঘুমন্ত রাত্রিতে ভেঙে বৃষ্টি হল শুরু,
তখন হাতের কাছে পাইনি আলো।।
সকাল হতে সারা মহল্লা থৈ থৈ,
বিছানা ছেড়ে জলদি করে;
মাছের জাল বয়ে সবে হৈ চৈ,
হাঁড়ি ভরে ট্যাঙরা পুটি ধরে।।
কাঁচা রাস্তা সব নীরব হয়ে বন্ধ,
হলো সবার মুশকিল!
ঘরে এখন তা নিয়ে বেঁধেছে দন্দ,
উঠান হয়েছে পিচ্ছিল।
সারাক্ষণ চলে ঝমঝম,
এদিক ওদিক বহে জল।
‘মাথা ও পায়ের স্থান কম’
এইতো বর্ষার চুড়ান্ত ফল!
কিছু সময় বয়ে যায়,
বর্ষার প্যাঁচপ্যাঁচানিতে।
এরই মাঝে শরৎকে পায়!
আনন্দের জবানিতে।
কখনো আসে ভরা বান,
কখনও টুপুর টুপুর,
কখনও হাওয়ার গান,
উড়ে সকাল দুপুর।।
শরীর করে শিম শিম,
শরৎ হয় প্রাণবন্ত!
ডেকে একটু হিম হিম,
সাড়া দিল হেমন্ত।
পার করে শরতের তান,
হেমন্তের গন্ধ গগনে উড়ে,
ধরে এক শান্তির গান,
পিঠে খেয়ে খেজুর গুড়ে।
চারিদিকে হালকা রোদে,
রসে টইটুম্বুর।
হাঁসুয়া হাতে খর্জর খোদে,
তার ডগায় তুলে সুর।
হেমন্তের ওই মিস্টি রসে,
ভরা জীবনে ব্যাঘাত ঘটে!
বাঁধা সবে শীতের বশে,
তার গীবত যেন মুখে রটে।
রসে ভরা হেমন্তের শেষে,
সবার মনে দুঃখ জাগে!
শীতের বসন উঠল হেসে,
বসন্তের দূত ডাকার আগে।
সূর্যও যেন কী বলে!
না বুঝতেই হয় দিন শেষ,
ঘড়ির কাঁটাও আনমনে চলে,
সবে পালন করে নীরবতার বেশ।
গাঢ় কুয়াশায় প্রভাত নাই!
হিমেল রাত্রি নীরব।
প্রভাতের আলোয় দেখতে পায়,
বসনের বাজারে মত্ত সব।
বেলা যায় শীতের আমেজ বুঝে,
ব্যস্ত চড়ুইভাতি আর বনভোজন।
কাজের সময় পায়না খুঁজে,
ব্যাকুলতায় ভুগে সবার মন।
আরও এক মজার কথা!
আছে গ্রীষ্মের মরণ বাকী,
শীতে এসে মাথা ব্যাথা,
পড়ে না তারা তাতে ফাঁকি!
গড়িয়ে যায় ঠকঠকানি,
তাপমাত্রা আইস বক্সে।
চঞ্চল কাঁপানি ঝাঁপানি,
নিশীথে সুর তুলে ফক্সে।
ছুটে চলে কুয়াশা খেয়ে,
ভোরের আলো দিশাহীন!
যেন অজানা রাস্তা বেয়ে,
সৃষ্টি করতে নতুন দিন।
“সুখসুখানির মজলিশে,
চুমুক দিয়ে যেন পায়,
কত ফেরেশ্তার সাথে মিশে!
দোজখ নামী স্বর্গে যাই!”
কারও গায়ে জড়া কম্বল,
সেজেছে যেন নরকের কীট!
ছেড়েছে সকল সম্বল,
উষ্ণতায় নিয়েছে সিট।
এবার হয়েছে শীতের অন্ত,
ডেকেছে গাছের যতো ফুল,
উথলেছে সবার বসন্ত,
ছেড়েছে সকলে শীতের কূল।
বসছে আজি বসন্ত সাজে,
মেঘের কূলে কূলে।
গুঞ্জরিত ভ্রমর বাজে,
ফুটন্ত ফুলে ফুলে।।
বসন্তরি কোকিল ডালে ডালে,
মন মাতানো সুরে।
কুহু কুহু ডাকে আড়ালে আড়ালে
একটু কাছে দূরে।।
সুন্দরের মাঝে তপ্ততেজ্বে ঝাঁঝেঁ,
যতো খাল বিল পুকুর।
পাঁকের মাটি ঠন ঠন বাজে,
তাতে চলে সকাল বিকেল দুপুর।
হাসি কান্নায় অস্থায়ী এই ছয় কাল,
ভাঙা গড়ার কর্ম কান্ডে।
কন্ঠ আমার তুলেছে সুর তাল,
এ জগৎ ব্রহ্মাণ্ডে।।
কবি কালাম হাবিব ১৯৯৯ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি মালদা জেলার সাহাবান চক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের একজন প্রতিশ্রুতিমান তরুণ কবি, নাট্যকার ও গদ্যকার। তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা স্কুল জীবনে হলেও দ্বাদশ শ্রেণির পর থেকে তাঁর কলম এক স্বতন্ত্র গভীরতা ও পরিণতি লাভ করে। কেবল কবিতা নয়—গল্প, গজল, নাটক ও প্রবন্ধ রচনায় তাঁর সমান মুন্সিয়ানা ইতিমধ্যেই পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
তাঁর একক প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ভারতবর্ষ’ (২০২৫) ও ‘ফিলিস্তিনের আত্মকথা’ (২০২৫)। এছাড়া ‘তোমার জন্য লিখেছি’, ‘ভালোবাসার ছায়াপথ’ ও ‘সাহিত্য বুলবুল’ তাঁর সম্পাদিত ও যুগ্ম কাব্য সংকলন। তাঁর মননশীল লেখা নিয়মিতভাবে রাজ্যের নামী পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে; যার মধ্যে সময় পট, সনেট পত্রিকা, সাহিত্য কুসুম, বুলবুল সাহিত্য পত্রিকা, মিজান সাপ্তাহিক পত্রিকা, নয়া জামানা ও দৈনিক নতুন পয়গাম পত্রিকা অন্যতম। মালদার ভূমিজ সংস্কৃতি ও জনজীবনের কথা তিনি ‘শেরশাবাদের কাগজ’ এবং ‘পঁহাত’-এর মতো পত্রিকায় আঞ্চলিক ভাষায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরছেন।
উদীয়মান তরুণ সাহিত্যিক হিসেবে তিনি সম্মানজনক “বঙ্গীয় যুব সাহিত্য পুরস্কার-২০২৬” লাভ করেছেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারসহ একাধিকবার ‘সপ্তাহের সেরা লেখক’ এবং ‘দৈনিক সেরা কবি’র সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। একজন প্রকৃত সাহিত্যিক হিসেবে তিনি কেবল মসিজীবী নন, বরং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সাথেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
