মুর্শিদাবাদের নবাব ও নবাবী, লেখক - মোহাঃ সামসুদ্দিন
মুর্শিদাবাদের নবাব ও নবাবী
মোহাঃ সামসুদ্দিন
নবাবের দেশ মুর্শিদাবাদ। তবে মুর্শিদাবাদের সবাই নবাব নন, কেউ কেউ নবাব। কিন্তু আমরা নবাব বলতে বুঝি সিরাজ উদ দৌলা কে। তাই এখন প্রশ্ন সিরাজ ছাড়া কেউ নবাব ছিলেন কি? থাকলে কত জন ছিলেন? তাদের নাম গুলো কি কি? হাজার দুয়ারী তৈরি করেন কে?কোন নবাব মুর্শিদাবাদ কে ভারতীয় ইউনিয়নে তুলে দেন ?ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা( অতি সংক্ষেপে)।
১) মুর্শিদকুলী খাঁ - মুঘল রাজ পরিবারের বাইরের প্রথম নবাব ছিলেন মুর্শিদ কুলী খাঁ। তাঁর উদ্যোগেই মাখসুদাবাদকে রাজধানীর উপযুক্ত করে সাজানো হয় এবং তাঁর উদ্যোগেই অর্থনৈতিক রাজধানী ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত হয় মুখসুদাবাদে। এই সময় মুখসুদাবাদের নাম বদলে রাখা হয় মুর্শিদাবাদ। অর্থাৎ তখন বাংলার রাজধানী ছিল দুটি। মূল রাজধানী ছিলে ঢাকা এবং দেওয়ানী রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। এই সময় মুর্শিদ কুলী খাঁ ছিলেন বাংলার দেওয়ান। তিনি কখনই নিজেকে নবাব বলে দাবি করেন নি। মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক কাটরা মসজিদ তিনিই নির্মাণ করেন।
২)নবাব সুজা উদ দৌলা - ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদ কুলী খাঁ অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। ফলে তাঁর জামাতা সুজা উদ দৌলা তাঁর স্থলাভিসিক্ত হন। তিনি শাহী মঞ্জিল, শাহী দরওয়াজা, দহপাড়া মসজিদ, ফারহাবাগ, রোশনিবাগ ইত্যাদি নির্মাণ করেন।
৩) নবাব সরফরাজ খাঁ - নবাব সরফরাজ খাঁ এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সরফরাজ খাঁ ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে নবাব হন। অসম্পূর্ণ ফৌটি মসজিদ তারই কীর্তি। নবাবী প্রাপ্তির মাত্র এক বছরের মধ্যে ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি গিরিয়া প্রান্তরে ষড়যন্ত্রের শিকার হন। তাঁর সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করেন তাঁরই বিশ্বস্থ সঙ্গী আলম চাঁদ। ইনি ছিলেন জৈন ব্যবসায়ী। জগৎ শেঠ পরিবারের সদস্য।
৪) নবাব আলিবর্দী খাঁ - রায় রায়া আলম চাঁদ ছিলেন নবাব সরফরাজ খানের সেনাপতি। তিনি বিহারের নায়েব দেওয়ান আলিবর্দীকে মুর্শিদাবাদের মসনদ দখল করার আহবান জানান। আলিবর্দী মুঘল সম্রাট কে চিঠি লেখেন। মুঘল সম্রাট আলিবর্দীকে মুর্শিদাবাদের মসনদ দখলের অধিকার দেন। কারণ, নবাব সরফরাজ খানের বহু দিনের খাজনা বাকি ছিল।
নবাব সরফরাজ খানের সেনাপতি রায় রায়া আলম চাঁদের সহযোগিতায় ও পথ নির্শনায় খুব সহজেই আলীবর্দী নবাব সরফরাজ কে পরাজিত ও হত্যা করতে সামর্থ্য হন। ফলে ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদাবাদের নতুন নবাব হন আলীবর্দী। আলীবর্দী ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ( মমতাজ ছাড়া) কোন এক মায়ের পৌত্র। অর্থাৎ আলীবর্দী ছিলেন মুঘল রক্তজাত।
৫) সিরাজ উদ দৌলা -১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর সিরাজ নবাব হন। সিরাজের প্রকৃত নাম মির্জা মুহাম্মদ। তিনি মুনসুর উল মূলক নবাব সিরাজ উদ দৌলা উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। মনসুর গঞ্জ প্রাসাদ, হলুদ মসজিদ, শ্বেত মসজিদ, মদিনা মসজিদ নির্মাণ তারই কীর্তি।
আলীবর্দী যে পদ্ধতিতে মুর্শিদাবাদের মসনদ দখল করেছিলেন, ঠিক একই পদ্ধতিতে মুর্শিদাবাদের মসনদ হারান সিরাজ। চিত্র নাট্য একই থাকে। শুধু বদলে যায় নায়কের ভূমিকা। এর আগে ছিলেন রায় রায়া আলম চাঁদ। এবার এলেন তাঁর উত্তর সুরি উমি চাঁদ। দুজনেই একই জগৎ শেঠ পরিবারের সদস্য।
৬) মীর জাফর - মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব শিবাজী, রানা প্রতাপ সিং দের ছেড়ে বিজাপুর, গোলকুন্ডা, আহমেদ নাগর তিনটি মুসলিম দেশ দখল নেন। এতে মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তিনি গোয়েন্দা মাধ্যেমে খবর পেয়ে ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে হজ্জে যান। হজ্জ থেকে ফেরার পথে, ইরাকের বাগদাদ থেকে নিয়ে আসেন হুসেন নাজাফি কে। বিয়ে দেন নিজের ভাইজির সঙ্গে। তাদেরই সন্তান হলেন মীর জাফর। বংশগত দিক থেকে মীর জাফর হলেন মুসলিম জাহানের খলিফা হযরত আলীর ২৪ তম বংশ ধর। সিরাজের পর তিনি নবাব হন । তিনি হলেন ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রের শিকার।
৬) মীর কাশিম - পলাশী যুদ্ধের পর মীর জাফর বুঝতে পারলেন , তিনি বিরাট ভুল করেছেন। তাকে নবাব করার পরিবর্তে জগৎ শেঠ পরিবার আর লর্ড ক্লাইভ ষড়যন্ত্র করেছে। সুতরাং তিনি তার প্রিয় পুত্র মীরন কে ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধে লিপ্ত করে দেন। ব্রিটিশরা গোয়েন্দা মাধ্যমে জানতে পেরে মীরন কে হত্যা করেন। রটিয়ে দেন বিজলি পড়ে মারা গেছে। এদিকে খবর হয় পুত্র শোকে মীর জাফর পাগল হয়ে গেছেন । সুতরাং তাকে কলকাতায় নির্বাসন দেওয়া হয়।
নতুন নবাব হন মীর কাসেম। তিনি শ্যালক ও শ্বশুরের পরিণতি দেখেছিলেন। আবার জগৎ শেঠ পরিবার বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতায় ও রাজী ছিলেন না। সুতরাং তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন বিহারের মুনগের। তিনি গিরিয়া, উদয়নালা, সুতি,বক্সার প্রভৃতি যুদ্ধে ব্যর্থ হলে চির তরে দেশান্তরিত হন।
মীর জাফর - মীর কাসিমের পর পুনরায় মীর জাফর নবাব হন। এবার মীর জাফর বুঝে গেছেন ব্রিটিশ শক্তিকে পরাজিত করা কোন ভারতীয় রাজার সম্ভব নয়। আবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বুঝে গেছেন জৈন জগৎ শেঠ পরিবার বা কোন হিন্দুকে নবাব করলে ভারত জুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে স্থাপনের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। তাই মীর জাফর নবাব হন। ( ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানী লাভ করে। তবে তার জন্য ক্লাইভ কে মুসলিম নাম ধারণ করতে হয়) ।
৭)নাজ মুদ দৌলা - নবাব মীর জাফরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নাজ মুদ দৌলা নবাব হন। তিনি ছিলেন মুন্নি বেগমের সন্তান। তবে তার ভাগ্যে নববীর সুখ টেকেনি।
৮) সাই ফুদ দৌলা - অবিবাহিত নবাব নাজ মুদ দৌলার মৃত্যুর পর নবাব হন তাঁর ছোট ভাই সাই ফুদ্ দৌলা। এই সময় নবাব ছিলেন নাবালক। তাই মুন্নি বেগম অভিভাবিকা নিযুক্ত হন। নবাব সাই ফুদ দৌলার আমলে কুখ্যাত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হয়। নবাব নিজেও ১৭৭০ কৃষ্টাবের ১০ মার্চ বসন্ত রোগে মারা যান।
৯) মোবারক দৌলা - সাই ফুদ দৌলার মৃত্যুর পর নবাব হন মোবারক দৌলা। ইনি ছিলেন মীর জাফরের আরেক স্ত্রী বাব্বু বেগমের সন্তান।মোবারক দৌলা ছিলেন খুব অহংকারী। শোনা যায় তিনি মুঘল রাজ পরিবার কন্যার বিয়ে দেন নি।
১০)বাবর আলী - মোবারক দৌলা মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বাবর আলী নবাব হন। তিনি প্রথম নাজিম উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বার্ষিক ষোলো লাখ টাকা বৃত্তি পেতেন।
১১)আলিজা - বাবর আলীর পর আলীজা নবাব হন। তার প্রকৃত নাম জৈনুদ্দিন আলী। তাঁর নবাব হওয়ার পথে অনেক বাধা ছিল। শেষ পর্যন্ত লর্ড মিন্টোর প্রচেষ্টায় তিনি নবাব হন।
১২) হুমায়ুন জা - আলিজার মৃত্যুর পর হুমায়ুন জা নবাব হন। তিনি ছিলেন শৌখিন শাসক। তার আমলে হুমায়ুন মঞ্জিল তৈরি হয়। হাজার দুয়ারী তাঁর অমর কীর্তি।
১৩) ফেরাদুনজা - হুমায়ুন জা মারা গেলে নবাব হন তাঁর পুত্র ফেরাদুন জা। তার আমলে বর্তমান ইমাম বাড়া তৈরি হয়। এটি এশিয়ার সবচেয়ে বড় ইমাম বাড়া। মুর্শিদাবাদে বেড়া ভাসান উৎসব তার আমলে শুরু হয়। তিনিই প্রথম পারস্যের খোঁয়াজ খিজির উৎসবের অনুকরণে বেরা ভাসান চালু করেন।
১৪) হাসান আলী - ফেরাদুন জার মৃত্যুর পর নবাব হন হাসান আলী। হাসান আলী নবাব হলেও বাস করতেন খড়ে ছাওয়া আটচালা ঘরে। শোনা যায় , তিনি ভূমিকম্পে ভয় পেতেন । তাই এইরূপ ব্যবস্থা। ১৯০৬ সালে তিনি মারা যান।
১৫) ওয়াসেফ আলী মির্জা - নবাব হাসান আলীর পর তার পুত্র ওয়সেফ আলী মির্জা নবাব হন। ওয়েসেফ আলী ছিলেন সুপন্ডিত। তিনি ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন। ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় ছিলেন তার গৃহ চিকিৎসক। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এক প্রকাশ্য সভায় বলেছিলেন , আমাকে সম্মান দিতে চাইলে বৃদ্ধ নবাব কে সম্মান দেন। তাঁর প্রচেষ্টা আর ইচ্ছাতেই দেশীয় রাজ্য মুর্শিদাবাদ ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করে।
১৬)ওয়ারেস আলী মির্জা - ওয়ারেস আলী মির্জা ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রাপ্ত। তিনি ছিলেন মুর্শিদাবাদের শেষ নবাব। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর। সঙ্গে সঙ্গে সমাপ্ত হয় মুর্শিদাবাদের নবাব ও নবাবীর।
১৭) ফতেয়াব আলী মির্জা _ ওয়ারেস আলী মির্জার মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ফাতেয়াব আলী মির্জা নবাবী পদ দাবি করে হাই কোর্টে মামলা করেন। তবে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। তিনি আবার সুপ্রীম কোর্টে যান। কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। তাঁর ছেলে জীবিত ৮৫ নম্বর পার্ক স্ট্রীট বাড়িতে বসবাস করেন।( দেশীয় রাজ্য মুর্শিদাবাদ ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করে শর্ত সাপেক্ষে বলেই ফতেয়াব আলী মির্জা এই আলোচক কে ২০১৫ নাগাদ জানিয়ে ছিলেন। বিতর্কের ভয়ে সে সব এড়িয়ে যাব না। অবশ্যই লিখব।)
ঋণ স্বীকার -
১) মুর্শিদাবাদ থেকে বলছি - কমল বন্দ্যোপাধ্যায়
২) মুর্শিদাবাদের ইতিহাস( জঙ্গিপুর) কাজী আমিনুল ইসলাম
৩) নবাব ও নবাবী। ফজলুল হক
৪) ঐতিহ্যের আলোকে মুর্শিদাবাদ - জেলা তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর
৫) মুর্শিদাবাদের ইতিহাস - নিখিল নাথ রায়
৫) নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ - সুশীল চৌধুরী
৬) ইতিহাসের আলোকে জঙ্গিপুর - মোহাঃ সামসুদ্দিন
( আরও বহু বই পুস্তক পত্র পত্রিকা সাক্ষাৎকার।)
